বর্তমানে বাংলাদেশে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বললে ভুল বলা হবে না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যেমন শুধুমাত্র একটি পৃথক দুর্ঘটনা দিয়ে বিচার করলে হবে না, তেমনি ছোট ছোট দুর্ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বিষয় বলে উড়িয়ে দেয়াটাও ঠিক হবে না। নিরাপত্তা বিষয়টি সবসময়ই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন হয়ে থাকে।
দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ইতিপূর্বে কোন সরকারই বিশেষ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। নিরাপত্তা নিয়ে যে কাজগুলো বিভিন্ন সময়ে হয়েছে সেটা অনেকটা দায়সারা রকমের। ফলে দেশ কখনোই শক্ত কোন নিরাপত্তা কাঠামোর উপর দাঁড়াতে পারেনি। বাস্তব অর্থে, যে কোন দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুটি বিশেষ কাঠামোর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। প্রথমটি হলো, বহিঃদেশীয় নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দ্বিতীয়টি হলো, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। উভয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই যেকোন দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বহিঃদেশীয় ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আলাদা করে বিবেচনা করলে ভুল পথে হাঁটা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঐতিহ্যগত সামরিক প্রতিরক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও বর্তমান সময়ে এটি বহুমাত্রিক কাঠামোগত ও অ-ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা দুর্বলতার সম্মুখীন হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কাজ করলেও সমন্বয়ের অভাব, সাইবার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ও জলবায়ুজনিত সংকট এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এছাড়াও বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভিন্ন পথে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভৌগলিক অবস্থানগত ভাবে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে ফলে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের কাছে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যার মধ্যে রয়েছে অদক্ষ ও অপর্যাপ্ত আইন প্রয়োগকারী কর্মী এবং আধুনিক কাঠামোগত দুর্বলতা। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সাইবার অবকাঠামো, সীমান্ত নিরাপত্তায় সক্ষমতার ঘাটতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ঝুঁকি এই ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বের 'পাওয়ার ব্যালান্স' বা ক্ষমতার মেরুকরণে বেশ কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাংলাদেশ 'স্ট্র্যাটেজিক প্র্যাগম্যাটিজম'' বা কৌশলগত বাস্তবতার নীতি মেনে চলার চেষ্টা করেছে। কোনো এক পক্ষের দিকে পুরোপুরি না ঝুঁকে, বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অবশ্য অতীতে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সে অবস্থানে কিছুটা হলেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয় ও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু দেশের সাথে সম্পর্কের দিক বিবেচনায় আনলে এ ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন প্রতীয়মান হচ্ছে। এ থেকে ধরে নেয়া যায়, বাংলাদেশ এ বিষয়ে বিশেষ চ্যালেঞ্জ এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এবার আসি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আন্দোলনের সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দেশের মানুষের কাছে এখনও তারা আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে পারেনি। ফলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের দুর্বলতা চোখে পড়ছে। সেই সাথে দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ততার জন্য পুলিশ এখনও ইমেজ সংকটে ভুগছে যার ফলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষাতে পুলিশ বাহিনী সাহসী ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এই বিষয়গুলো ছাড়াও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্ক যুক্ত আরও কিছু ইস্যু রয়েছে। সে দুর্বলতাগুলোও নিরাপত্তা পরিকল্পনা করার সময় আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সেগুলো হলো-
- কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব: একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তা প্ল্যান ও কার্যকরী কৌশলের অভাব বাংলাদেশে রয়েছে। যার ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে, কিভাবে সেটা প্রতিহত করা হবে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সমন্বিত নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
- সমন্বয়ের ঘাটতি: গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ারিং ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের দুর্বলতা সামগ্রিক নিরাপত্তাহানির আরেকটি কারণ।
- সম্পদের সীমাবদ্ধতা: জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য আধুনিক যান ও উন্নত প্রযুক্তির বেশ অভাব রয়েছে পুলিশ বাহিনীতে।
- সাইবার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা সুরক্ষা আইন ও তার প্রয়োগ: সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৬ প্রবর্তন হলেও এর মধ্যে রয়ে গেছে বিভিন্ন আইনি অস্পষ্টতা ও প্রয়োগিক সীমাবদ্ধতা যার সুযোগে সুবিধাবাদী মহল বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।
- সরকারি ডাটাবেজের ভঙ্গুরতা: সরকারি বিভিন্ন সংবেদনশীল ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডাটাবেজে কারিগরি অবহেলা থাকায় অতীতে বড় ধরণের তথ্য ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বারবার সাধারণ মানুষের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়েছে।
- সাইবার হামলা: রাষ্ট্রীয় এবং বাণিজ্যিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ চুরির মতো ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটেছে।
এছাড়াও অ-ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা ঝুঁকি (নন-ট্র্যাডিশনাল থ্রেট) আমাদের নিরাপত্তাকে আরো নাজুক করে তুলেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
- জলবায়ু পরিবর্তন: দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের খাদ্য ও ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
- অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা,অর্থ পাচার এবং সর্বস্তরের দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে।
- রোহিঙ্গা সংকট: কক্সবাজার ও টেকনাফ অঞ্চলে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিক দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: তীব্র রাজনৈতিক বিভক্তি এবং নীতিগত অস্থিরতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। রাজনৈতিক বিভক্তি আরও বেড়ে গেলে, দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে। সেই সুযোগে বাইরের কোন শক্তির হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি: বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী দলগুলোর দ্বারা সরাসরি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা জনগণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিরাপত্তা ব্যাহত করছে।
তাহলে উত্তরণের পথ বা উপায় কি? আমার মতে, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল দ্রুত গঠন করে কার্যকরী নিরাপত্তা কাঠামো ও পরিকল্পনা তৈরি করা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একটি সুসমন্বিত, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। যা আমাদের দেশ ও দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখবে।
লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
৩ হাজার বছরেরও অধিক প্রাচীন ‘তেলাহারা বিশ্ববিদ্যালয়’
রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রয়োজন মুক্ত চিন্তা
অজ্ঞতার অন্ধকারে ঘৃণার জন্ম, জ্ঞানই পারে সহনশীল সমাজ গড়তে