বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ভোটাধিকার হরণ করে কোনো সরকার বৈধ থাকতে পারে না। জনগণের রায় ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি চরম অবজ্ঞা।’
তিনি বলেন, ‘মানুষের কথা বলার অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন তাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হবে। বিগত ১৭ বছর এ দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। দিনের ভোট রাতে হয়েছে। দেশের মানুষ আজ একজন যোগ্য অভিভাবক চায়, যারা তাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করবে এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।’
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ময়মনসিংহ ঐতিহ্যবাহী সার্কিট হাউজ মাঠে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
২৫ মিনিটের এই দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বিকাল সাড়ে ৩টার তারেক রহমান মঞ্চে উঠলে মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল। এ সময় হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন তিনি।
সারা দেশে নির্বাচনি প্রচারের অংশ হিসেবে দুপুরে সড়ক পথে ময়মনসিংহ পৌঁছান, তার সাথে রয়েছেন সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ ২২ বছর বাদে ময়মনসিংহ সফরে এলেন তিনি।
এ সমাবেশ ঘিরে ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মী-সমর্থকরা মিছিল নিয়ে আসেন এ সমাবেশে। এর বাইরে জামালপুর, নেত্রকোণা ও শেরপুর থেকে বাসে করে লাখ লাখ দলীয় নেতাকর্মীরা এসেছেন। দুপুর আড়াইটার পর সার্কিট হাউজ মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়।
সমাবেশে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনের ধানের শীষের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আরো বলেন, একটি দল স্বৈরাচারী ভাষায় বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। তারা আমাদেরকে বলে আমরা নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। অথচ বিএনপি সরকারের সময়ে তাদেরই দু’জন নেতা মন্ত্রিসভায় ছিলেন। আমরা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হতাম, তবে তারা তখন পদত্যাগ করলেন না কেন? আসলে তাদের কোনো রাজনৈতিক জনভিত্তি নেই বলেই তারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে।
ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘এই এলাকায় দীর্ঘদিন কোনো উন্নয়ন হয়নি। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছে।’
তিনি ঘোষণা করেন, এ অঞ্চলে মাছ চাষকে শিল্পে রূপান্তর করা হবে যাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কৃষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তাদেরকে সরাসরি সেবা দিতে ‘কৃষি কার্ড’ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই কৃষক সরাসরি সরকারি সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ হাতে পাবেন।
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, কৃষির পানির অভাব দূর করতে খাল পুনর্খনন করা হবে। তিনি স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনের পর আপনারা কোদাল ধরলে আমি আপনাদের সাথে থাকবো।’
নারীদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের ১ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা সেই ধারা বজায় রেখে নারীদের অভাব অনটন দূর করার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করবো, যা প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।’
তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘মাদকের অভিশাপ থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে কর্মসংস্থান জরুরি। আমরা আইটি সেক্টরে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো যাতে আমাদের তরুণরা ঘরে বসেই বিশ্ব জয় করতে পারে।’
স্বাস্থ্যসেবা ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, জেলা হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ইউনিয়ন পর্যায়ে পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে উন্নত সেবার ব্যবস্থা করা হবে। শিশু ও মা-বোনদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঘরে ঘরে হেলথকেয়ার সেবা পৌঁছে দেয়া হবে। এছাড়াও তিনি ঘোষণা করেন, ক্ষমতায় এলে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সেবায় নিয়োজিত ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও সম্মানজনক বেতনের ব্যবস্থা করবে বিএনপি সরকার।
তারেক রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ জন বিএনপি প্রার্থীকে ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। ভোটারদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটের দিন তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ে এলাকার মানুষকে সাথে নিয়ে ফজর বাদ ভোটকেন্দ্রে যাবেন। শুধু ভোট দিয়ে চলে আসলে হবে না। বিগত দিনে আমাদের ভোট লুটপাট হয়েছে। তাই এবার ভোট দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র ছাড়া যাবে না।
ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ ময়দানে দেয়া ভাষণের শেষ অংশে তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, আর ২০২৪ সালে স্বৈরাচারকে বিদায় করে জনগণ সেই স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। এখন সময় দেশ গড়ার। ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমরা সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবো।’
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করছেন বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদ আবু ওয়াহাব আকন্দ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার, উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদা সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, কেন্ত্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান সালেহীন প্রিন্স, রাশিদুজ্জামন মিল্লাদ, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল আলম, বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুন, শেরপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক এনায়েত উল্লাহ কালাম, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন মনি, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খান সহ ২৪টি আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীগণ।