বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা সকল ধর্মের মানুষকে বুকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। আল্লাহর দেওয়া বিধান কখনো কারও ওপর জুলুম করতে পারে না, বরং এটিই প্রকৃত ইনসাফ নিশ্চিত করে। এই দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ- সবাই মিলে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা এই জাতিকে আর বিভক্ত হতে দেব না। আমাদের ১১ দলীয় জোটের মূল লক্ষ্যই হলো একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা।’
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনসভায় জামায়াত আমির তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে। শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং শিক্ষা শেষে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পাবে। এ দেশের মা, বোন ও কন্যারা পাবে পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদা। তারা আল্লাহর দেওয়া সমস্ত অধিকার ভোগ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ যাকে সম্মান করতে বলেছেন, আমরা তাকে সম্মান করব। যাকে ভালোবাসতে বলেছেন, তাকে ভালোবাসব। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তিকে ভয় করব না। গত ৫৪ বছর ধরে দেশে একটি ভীতির রাজত্ব কায়েম করে রাখা হয়েছিল। গত জুলাইয়ে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে রক্ত দিয়েছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, তাদের অঙ্গীকার ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারপূর্ণ বাংলাদেশ। রাস্তায় তাদের সেই ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানই প্রমাণ করে যে, সমাজে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা কতটা জরুরি। আর সেই ন্যায়বিচারের একমাত্র উৎস হলো আল্লাহর বিধান।’
দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ; আল্লাহর মেহেরবানিতে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে আমরা কাউকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি করতে দেব না। এ দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে- এমন বংশানুক্রমিক বা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি আর চলবে না। রাজনীতি হবে মেধা, যোগ্যতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে। আধিপত্যবাদী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে।’
যুবসমাজের প্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, ‘শিশু জন্ম নেওয়ার পর তার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেবে সরকার। ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে মেডিকেল কলেজ এবং শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হবে যা মানুষকে দেশ গড়ার দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলবে।’
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখ দুটি ভোট হবে। একটি গণভোট, যেখানে ‘হ্যাঁ’ মানেই নতুন বাংলাদেশ এবং পুরনো খুনের রাজনীতি ও আয়নাঘর প্রথাকে চিরতরে ‘লাল কার্ড’ দেখানো। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, আর ‘না’ মানে গোলামি। দ্বিতীয় ভোটটি হবে সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য। আপনারা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। যারা লোভ সামলাতে পারে না, তাদের হাতে জনগণের জানমালের আমানত দেওয়া যায় না। যারা একসময় মজলুম ছিলেন, তারাও এখন বদলে গেছেন। দখলদারিত্বের মোহে তারা এখন আমাদের গালি দিচ্ছেন এবং আক্রমণ করছেন।’
রাজশাহীর স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে একটি আধুনিক ডেন্টাল কলেজ স্থাপন করা আমাদের অগ্রাধিকার। এছাড়া চুরির কারণে বন্ধ ও লোকসানে থাকা সুগার মিলগুলো আমরা পুনরায় চালু করব। ব্লু-ইকোনোমিতে (নীল অর্থনীতি) আমাদের প্রবেশের বিশাল সুযোগ রয়েছে। কোনো বহিঃশক্তির চোখ রাঙানি পরোয়া না করে দেশের সম্পদ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো হবে।’
পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত বা দলীয় বিজয়ের চেয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়কে বড় করে দেখি। কোনো অশুভ শক্তি যেন এই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নস্যাৎ করতে না পারে, সেজন্য নেতাকর্মীদের সিনা মজবুত করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির ড. মাওলানা কেরামত আলীর সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুসহ জোটের শীর্ষ নেতারা। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, প্রায় দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মী এই জনসভায় উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে প্রায় ৬০ হাজারই ছিলেন নারী। জনসভা শেষে রাজশাহীর ৬টি আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দেওয়া হয়।