কৃষককে ঋণমুক্ত করার পাশাপাশি লোকসানমুক্তও করুন: পাটওয়ারী

সরকারের কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে উল্লেখ করলেও কৃষকের লোকসানের মূল কারণগুলো দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর মতে, সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, পথে চাঁদাবাজি এবং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ না হলে ঋণ মওকুফের পরও কৃষককে আবার ঋণ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র কৃষকদের সুদসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার কৃষক। উদ্যোগটি আপাতত স্বস্তি দিলেও সেই স্বস্তি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষকের ১০ হাজার টাকার ঋণ মওকুফ করে তাঁকে আবার একই ঋণনির্ভর ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ঋণ মওকুফ করা হলেও কৃষক কেন বারবার ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, সেই কারণগুলো দূর করা জরুরি।

সারের ডিলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তিনি দাবি করেন, লক্ষ্মীপুরে নির্বাচিত ৫৭ জন ডিলারের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে, পীরগাছায় ডিলারশিপকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বেশি লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অযোগ্য হয়ে যান না। তবে লাখ লাখ টাকা দিয়ে ডিলারশিপ কেনাবেচার অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, ডিলাররা কৃষককে সেবা দেওয়ার জন্য এত টাকা বিনিয়োগ করছেন, নাকি সারের দাম বাড়িয়ে সেই অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। সরকারের দেওয়া কৃষি ভর্তুকির সুফল নিয়েও যাতে অনিয়মের মাধ্যমে ভাগবাঁটোয়ারা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থায় উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার দামের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, পঞ্চগড়ে কৃষকের কাছ থেকে ২–৩ টাকায় কেনা লাউ ঢাকায় এসে ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে লাউয়ের দাম প্রায় ২০ গুণ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে চাষির ভাগ্যের উন্নতি হচ্ছে না।

পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরির মতো খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, পথে পথে চাঁদাবাজি এবং বাজারের সিন্ডিকেটের কারণে দামের ওপর কী প্রভাব পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষক পণ্য বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যবসায়িক লাভের হিসাব কোথায়—সেই প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে সারের ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বাড়তি দামে সার বিক্রি বন্ধ করা, পথে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।

তিনি বলেন, শুধু ঋণ মওকুফ করে কৃষকের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রতিবছর নতুন করে ঋণ মওকুফের প্রয়োজন না পড়ে। কৃষককে ঋণমুক্ত করার পাশাপাশি লোকসানমুক্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।

পোস্টের শেষাংশে পঞ্চগড়ে কৃষকের কাছ থেকে ২ টাকায় কেনা লাউ ঢাকায় ৬০ টাকায় বিক্রির উদাহরণ তুলে ধরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, মাঝখানের এই ৫৮ টাকার ব্যবধানের হিসাব জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।