কাকে জাকাত দেওয়া যাবে আর কাকে দেওয়া যাবে না?

ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইবাদত হলো সালাত ও জাকাত। পবিত্র কুরআনে বহুবার সালাত প্রতিষ্ঠা এবং জাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাকাত শুধু দান নয়; এটি ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জাকাত দেওয়ার সময় অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান—কাকে জাকাত দেওয়া যাবে আর কাকে দেওয়া যাবে না। তাই কুরআন-হাদিস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিষয়টি সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

কুরআনে সালাত ও জাকাতের নির্দেশ

 

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা নিজেদের জন্য যে উত্তম কাজ অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১১০)

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসুলের আনুগত্য করো—যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো।’ (সুরা নূর: আয়াত ৫৬)

জাকাতের নির্ধারিত খাত

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

‘জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা: আয়াত ৬০)

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে

১. যে দরিদ্র ব্যক্তির কাছে অতি সামান্য সম্পদ আছে অথবা কিছুই নেই, এমনকি একদিনের খাদ্যও নেই—শরীয়তের দৃষ্টিতে সে গরিব। তাকে জাকাত দেওয়া যাবে।

২. যে ব্যক্তির কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদও নিসাব পরিমাণ নেই এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অন্য সম্পদও নিসাব পরিমাণ নেই—তাকে জাকাত দেওয়া যাবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১০৫৩৬)

৩. যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত এবং ঋণ পরিশোধ করার পর তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না, তাকে জাকাত দেওয়া যাবে।

৪. কোনো ব্যক্তি নিজ শহরে ধনী হলেও সফরে এসে অভাবে পড়ে গেলে বা তার মাল-সামান চুরি হয়ে গেলে তাকে জাকাত দেওয়া যাবে। তবে সে শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী নিতে পারবে।

৫. জাকাত এমন দরিদ্রকে দেওয়া উত্তম যে দ্বীনদার। তবে দ্বীনদার নয় এমন লোক যদি উপযুক্ত হয় তাহলে তাকেও জাকাত দেওয়া যাবে। কিন্তু যদি প্রবল ধারণা হয় যে সে টাকা গুনাহের কাজে ব্যয় করবে তাহলে তাকে জাকাত দেওয়া যাবে না।

৬. জাকাত শুধু মুসলমানদেরকেই দেওয়া যাবে। কোনো অমুসলিমকে জাকাত দিলে জাকাত আদায় হবে না। তবে নফল দান অমুসলিমকে করা যাবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজযাক ৭১৬৬, ৭১৬৭, ৭১৭০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৬/৫১৬-৫১৭)


৭. জাকাতের টাকা জাকাতের হকদারদের মালিকানায় পৌঁছাতে হবে। অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করলে জাকাত আদায় হবে না। যেমন—

রাস্তা নির্মাণ
সেতু নির্মাণ
কূপ খনন
বিদ্যুৎ বা পানির ব্যবস্থা

৮. জাকাত আদায়ের জন্য শর্ত হলো উপযুক্ত ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেওয়া। যদি নিজের সিদ্ধান্তে তার ঘর মেরামত করে দেওয়া হয় বা বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে জাকাত আদায় হবে না। নিয়ম হলো দরিদ্র ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেওয়া। এরপর সে নিজের ইচ্ছায় ব্যয় করলে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৭)

৯. আত্মীয়-স্বজন জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হলে তাদের দেওয়া উত্তম। যেমন—

ভাই-বোন
চাচা-মামা
ফুফু-খালা
ভাতিজা-ভাগনে

জাকাতের কথা উল্লেখ না করে মনে মনে নিয়ত করলেও জাকাত আদায় হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজযাক ৭১৬০–৭১৭১, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৬/৫৪২-৫৪৬)

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে না

১. যে ব্যক্তির কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ যেমন সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা বা বাণিজ্যদ্রব্য নিসাব পরিমাণ আছে সে ধনী। তাকে জাকাত দেওয়া যাবে না।

২. যে ব্যক্তির কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ নিসাব পরিমাণ নেই, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন সম্পদ আছে যাতে জাকাত আসে না—যেমন আসবাবপত্র, পোশাক, জুতা বা গার্হস্থ্য সামগ্রী—এগুলো নিসাব পরিমাণ হলে তাকেও জাকাত দেওয়া যাবে না। তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। (মুসান্নাফে আবদুর রাজযাক ৭১৫৬)

৩. জাকাতের টাকা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করলে জাকাত আদায় হবে না। যেমন—

রাস্তা নির্মাণ
সেতু নির্মাণ
কূপ খনন
বিদ্যুৎ বা পানির ব্যবস্থা

৪. জাকাতের টাকা দ্বারা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, ইসলাম প্রচার, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন, ওয়াজ মাহফিল বা দ্বীনি বই প্রকাশ করা জায়েজ নয়। জাকাতের টাকা হকদারকেই দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজযাক ৬৯৪৭, ৬৯৪৮, ৭১৩৭, ৭১৭০)

৫. নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী এবং ঊর্ধ্বতন বংশধরকে জাকাত দেওয়া যাবে না। তেমনি নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি এবং অধস্তন বংশধরকে জাকাত দেওয়া যাবে না। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত দিতে পারবেন না। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮)

৬. কাজের ছেলে বা মেয়েকে জাকাত দেওয়া যাবে যদি তারা উপযুক্ত হয়। কিন্তু পারিশ্রমিক হিসেবে জাকাত দিলে জাকাত আদায় হবে না। আগেই চুক্তিকৃত টাকা জাকাত হিসেবে দেওয়া যাবে না।

৭. কাউকে জাকাত দেওয়ার পর জানা গেল সে ধনী ছিল, তবুও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। তবে গ্রহীতা জানলে টাকা ফেরত দেওয়া তার জন্য ওয়াজিব।

৮. জাকাত দেওয়ার পর জানা গেল গ্রহীতা অমুসলিম ছিল—তাহলে জাকাত আদায় হবে না। পুনরায় জাকাত দিতে হবে।

৯. বুঝমান অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েকেও জাকাত দেওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৭, আলবাহরুর রায়েক ২/২০১ )

জাকাত ইসলামের একটি মহান সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইবাদত, যা ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং দরিদ্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তবে সঠিক ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্য কোথাও ব্যয় করলে জাকাত আদায় হয় না।

তাই জাকাত আদায়ের আগে কারা প্রকৃত হকদার—এ বিষয়টি জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। সঠিকভাবে জাকাত আদায় করলে তা শুধু একটি ফরজ ইবাদত পূর্ণ করে না, বরং সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে।