রোজা রেখে কি ইনহেলার নেওয়া যাবে

রমজান মাসে ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি অসুস্থ ও শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে একটি প্রশ্ন প্রতিবছরই বড় হয়ে দেখা দেয় রোজা রেখে কি ইনহেলার ব্যবহার করা যাবে? ধর্মীয় সংশয় আর বিভ্রান্তির কারণে অনেক রোগী চরম শ্বাসকষ্ট সহ্য করেও ইনহেলার নেন না, যা অনেক সময় জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আধুনিক ইসলামি ফিকহ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও মানবিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

সাধারণত ধারণা করা হয়, মুখ দিয়ে কোনো কিছু প্রবেশ করলেই রোজা ভেঙে যায়। তবে ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, রোজা ভঙ্গের প্রধান কারণ মূলত তিনটি: খাদ্য গ্রহণ, পানীয় গ্রহণ এবং শরীরে শক্তি বা পুষ্টি জোগায় এমন কিছুর প্রবেশ। ইনহেলার কি এই তালিকার মধ্যে পড়ে? সমসাময়িক অধিকাংশ আলেম ও ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতে না।

কেন ইনহেলারে রোজা ভাঙে না?

অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষণার নির্যাস থেকে ইনহেলার ব্যবহারের পক্ষে কয়েকটি শক্তিশালী যুক্তি উঠে এসেছে:

  • পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না: ইনহেলার মূলত ফুসফুসে গিয়ে কাজ করে, পাকস্থলীতে নয়।
  • পুষ্টিগুণহীন: এতে কোনো ক্যালরি বা পুষ্টি নেই যা শরীরের ক্ষুধা মেটায় বা শক্তি জোগায়।
  • জরুরি চিকিৎসা: এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।

যদিও একটি সংখ্যালঘু মত অনুযায়ী মুখ দিয়ে প্রবেশের কারণে রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা বলা হয়, তবে আধুনিক চিকিৎসা বিশ্লেষণ ও শরীয়তের সহজীকরণের নীতির সামনে সেই মতটি বর্তমানে ততোটা জোরালো নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

চিকিৎসকদের মতে, ইনহেলার হলো একটি ‘লোকাল মেডিসিন’। এটি কেবল শ্বাসনালীর পথকে প্রশস্ত করে। খাবারের মতো এটি হজম হয় না বা রক্তে মিশে শরীরের ক্লান্তি দূর করে না। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, ‘রোজা ভাঙার ভয়ে ইনহেলার বন্ধ রাখলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন বা তার অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে, যা ইসলামের মূল চেতনার (জীবন রক্ষা) পরিপন্থি।’

পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অসুস্থদের জন্য স্পষ্ট ছাড় দিয়েছেন। অসুস্থ অবস্থায় রোজা রাখতে না পারলে পরবর্তীতে তা পূরণ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম কখনোই মানুষকে আত্মনাশের অনুমতি দেয় না।

‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কষ্ট দিতে চান না।’ (সূরা বাকারা: ১৮৫)

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

  • সচেতনতা: মসজিদের ইমাম ও আলেমদের উচিত ইনহেলার বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা যাতে সাধারণ মানুষের মনে ভয় দূর হয়।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: হাঁপানি রোগীরা রমজানের আগেই চিকিৎসকের সাথে কথা বলে ওষুধের ডোজ সমন্বয় করে নিতে পারেন।
  • বিকল্প ব্যবস্থা: যদি কারো অসুস্থতা এমন হয় যে রোজা রাখা সম্ভবই নয়, তবে ইসলামে 'কাজা' বা 'ফিদইয়া'র (বিনিময়) বিধান রাখা হয়েছে।

ধর্মীয় অজ্ঞতা যেন কারো প্রাণহানির কারণ না হয়। ইসলাম একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জীবনবিধান। তাই শ্বাসকষ্টের রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রেখে ইনহেলার ব্যবহার করা কেবল জায়েজই নয়, বরং জীবন রক্ষায় এটি অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।