পারস্পরিক সম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মায়াজাল মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের আবহ সৃষ্টি করে। খাঁটি অলঙ্কারের চেয়ে খাঁটি বন্ধুর মূল্য অনেক বেশি। কারণ অলঙ্কারের বাস শরীরে, মনের মধ্যে নয়। কিন্তু একজন ভালো বন্ধু বাস করে মনের মধ্যে, চেতনার গহীনে। বন্ধুতো বানাতে হবে; তাই বলে যাকে-তাকে বন্ধু বানানো যায় না। কারণ জীবনে বন্ধুর প্রভাব পড়ে। ভালো বন্ধু একজন খারাপ মানুষকে ভালো বানাতে সাহায্য করতে পারে, পক্ষান্তরে খারাপ বন্ধু একজন ভালো মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অধঃপতনের অতল তলে। বন্ধুত্ব তৈরির আগে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা আবশ্যক।
মানবজীবনে আদর্শ বন্ধু নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যারা এরূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ (সুরা আলে ইমরান : ২)। আল্লাহপাক আরও ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’
(সুরা তাওবা : ১১৯)।
হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ভালো এবং দুষ্ট ব্যক্তি মিশক (সুগন্ধি) বহনকারী ও হাঁপরে ফুঁকদাতা (কামার) ব্যক্তির মতো। মিশক বহনকারী ব্যক্তির অবস্থা তো এমন যে সে হয়তো এ মিশক তোমাকে উপহার দেবে অথবা তুমি তার থেকে তা খরিদ করবে অথবা তুমি তার থেকে এর সুঘ্রাণ লাভ করবে। আর হাপরে ফুঁকদাতা ব্যক্তি হয়তো সে তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।’ (বুখারি : ২৬৪১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অসৎ সঙ্গীর চেয়ে একাকিত্ব ভালো। আর একাকিত্বের চেয়ে সৎ সঙ্গী ভালো।’ (বুখারি : ২৪৩৯)।
আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘এক ব্যক্তি নিজ গ্রামের বাইরে অন্য গ্রামে তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, ফলে তার রাস্তায় আল্লাহ তায়ালা এক ফেরেশতাকে পাহারাদার হিসেবে নির্ধারণ করেন, অতঃপর যখন সে তার কাছে পৌঁছে, তখন ফেরেশতাগণ বলে, কোথায় যাচ্ছ? সে উত্তরে বলে, এই গ্রামে এক ভাইয়ের কাছে যাচ্ছি। ফেরেশতা বলে, ওর প্রতি তোমার কোনো অনুগ্রহ আছে কি, যা তুমি সম্পাদন করতে যাচ্ছ? সে বলে, না, কিন্তু আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি। ফেরেশতা বলে, আমি তোমার কাছে আল্লাহর দূত, আল্লাহ তোমাকে ভালোবেসেছেন, যেমন, তুমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবেসেছো’। (মুসলিম : ১৭৫৩)।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব-চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা যেন অবশ্যই যাচাই করে নেয়।’ (তিরমিজি : ২৩৪৭)।
হজরত আলী (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি চিন্তা-ভাবনা করে যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ করে বন্ধু নির্বাচন করবে, তাদের বন্ধুত্ব বজায় থাকবে এবং তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হবে।
হজরত ইমাম গাজালি (রাহ.) বলেন তিনটি গুণ যার আছে তাকে বন্ধ বানাতে হবে। গুণগুলো হলো
এক. বন্ধুকে হতে হবে জ্ঞানী, বিচক্ষণ।
দুই. বন্ধুর চরিত্র হতে হবে সুন্দর ও মাধুর্যময়।
তিন. বন্ধুকে হতে হবে নেককার, পূণ্যবান। অর্থ্যাৎ-বুদ্ধিমত্তা ও সৎ স্বভাবের অধিকারী হওয়া এবং পাপাচারী, বেদআতি ও দুনিয়াসক্ত না হওয়া। কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করার পূর্বে আমাদের তার সম্পর্কে জানা উচিত, যে আমরা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চলেছি। কথায় আছে ‘সৎ সঙ্গে সর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। তাই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনাগুলো সামনে রেখে বন্ধু নির্বাচন করা জরুরি।
মানুষ স্বভাবগতভাবেই তার সঙ্গীর আচার-আচরণ ও রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রিয়নবী (স.) সতর্ক করে বলেছেন—
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতি অনুসরণ করে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩)
পবিত্র কুরআনেও প্রকৃত ইমানদারদের গুণাবলী বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে তারা একে অপরের সুহৃদ ও বন্ধু। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
‘আর ইমানদার পুরুষ এবং ইমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। তাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৭১)