কবর জিয়ারত মানুষকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুনিয়ার অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখে। এ কারণেই কবর জিয়ারত করা সুন্নাত। এ সুন্নাত আমল কি শুধু পুরুষের জন্য? নারীরা কি বাবা-মা, স্বামী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করতে পারবেন? এ সম্পর্কে ইসলামের দিক-নির্দেশনাই বা কী?
দুনিয়ার খ্যাতি, সম্পদের প্রতিযোগিতা কিংবা ক্ষমতার মোহ কমাতে কবর জিয়ারতের বিকল্প নেই। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে কবর জিয়ারত করতে বলেছেন। এটি একটি সুন্নতি আমল।
নারীর কবর জিয়ারত
তবে এক সময় নারীদের কবর জিয়ারতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরবর্তীতে তা তুলে নেওয়া হয়েছে মর্মে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগে নারীদের জন্য কবর জিয়ারত করা নিষেধ ছিল। পরে নারীদের কবর জিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়। বিধায় তারাও কবর জিয়ারত করতে পারবেন। একাধিক হাদিস থেকে তা প্রমাণিত-
- হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, ‘হজরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রতি জুমআবার তার চাচা হজরত হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবর জিয়ারত করতেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম)
- উম্মাহাতুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও কবর জিয়ারত করতেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবি মুলাইকা বলেন, একদিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কবরস্থান থেকে আসলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কোথা থেকে আসলেন? তিনি বললেন, আমি আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকরের কবরের কাছ থেকে আসলাম।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেননি?
তিনি উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ’, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কবর জিয়ারতের আদেশ করেছিলেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম, বায়হাকি)
‘হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হজরত আবু বকর সিদ্দিক ও হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কবর জিয়ারত করতেন।’
‘নারীর কবর জিয়ারতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী। নারীর কবর জিয়ারতের নিষেধাজ্ঞার সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইমাম তিরমিজি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি বলেছেন, ইসলামিক স্কলারদের মতে, যে হাদিসে কবর জিয়ারতকারী নারীদের অভিশাপ করা হয়েছিল; সেটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগের হাদিস। তখন কবর জিয়ারত ইসলামে নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে যখন নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়ে কবর জিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয় তখন সে অনুমতি পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবার জন্যই দেওয়া হয়েছে।’
নারীর কবর জিয়ারতের অনুমতি দেওয়ার পরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়ে ফাতেমা ও স্ত্রী হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেদের আপনজনদের কবর জিয়ারত করেছেন মর্মে হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।
নারীর কবর জিয়ারতের শর্ত
তবে নারীর কবর জিয়ারতে রয়েছে শর্ত। কবর জিয়ারত করতে গিয়ে বেপর্দা হওয়া যাবে না। পর্দা রক্ষা করে সম্ভব হলেই কেবল নারীরা আজনজনদের কবর জিয়ারত করতে পারবেন। তাই নারীদের জন্য কবরস্থানের পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কবরস্থানে কান্নাকাটি বিলাপ বা যে কোনো ধরনের শোরগোল করা যাবে না।
নারীর কবর জিয়ারতের বিশেষ সতর্কতা
পর্দা ও পবিত্রতার সব শর্ত রক্ষা করে নারীরা আপনজনের কবরের কাছে যেতে পারবেন। তবে তাদের জন্য পুরুষের মতো কবর জিয়ারতের সাধারণ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কারণ ইসলামের শত্রুরা নারীর কবর জিয়ারতকে অমর্যাদা হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করে। আর যারা ইসলামী শরীয়তের অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলেন, তারা বেগানা পুরুষের কবরের পাশেও পর্দা রক্ষা করেন। অবশ্য একাকী কিংবা পারিবারিক কবরস্থানে যাওয়া বা কাছ থেকে দেখা, তাদের জন্য দোয়া করা নারীর জন্য নিষেধ নয়।
আপনজনদের কবরস্থানে যাওয়ার বা দোয়া করার অনুমতি থাকলেও নারীদের জন্য জানাজার নামাজে শরিক হওয়ার কোনো বিধান ইসলামি শরিয়তে নেই। আবার আলাদাভাবে জানাজা নামাজ বা মূল জামায়াতে কোথাও তারা জানাজা পড়তে পারবেন না। নারীদের জন্য জানাজা ওয়াজিবও নয়। তবে তারা মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া, দরূদ, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি করতে পারবেন। (জামেউল ফাতাওয়া, ইসলামি ফিক্হ ও ফাতাওয়া বিশ্বকোষ)
সুতরাং, মুমিন মুসলমান নারীর উচিত, পর্দা ও পবিত্রতার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। কোনো ধরনের ফেতনা ও পর্দার লঙ্ঘন না হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে আপনজনদের কবর জিয়ারত করতে যাওয়া। পর্দার খেলাপ হয় এমন অনুগামী হয়ে পুরুষদের সংশ্রব ও সংমিশ্রণ এড়িয়ে চলা। কবরের পাশে উচ্চ স্বরে বিলাপ বা শোরগোল থেকে মুক্ত থাকা। পর্দা ও পবিত্রতার খেলাপ হবে মনে করলে নারীদের কবর জিয়ারত করতে না যাওয়াই উত্তম।