শান্ত নীল আকাশের ওপারে আমাদের প্রাণদাতা সূর্য এখন রণংদেহী মূর্তিতে। সূর্যের উপরিভাগ থেকে ধেয়ে আসছে লকলকে অগ্নিশিখা বা সোলার ফ্লেয়ার, যা যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। এই শক্তিশালী সৌরঝড়ের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া বা ‘রেডিও ব্ল্যাকআউট’-এর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO) এবং মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা (NASA)।
২০২৬ সালের শুরুতেই সূর্যের এমন অস্বাভাবিক আচরণ বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে গত ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি সূর্যের ‘অ্যাক্টিভ রিজিয়ন ১৪৩৬৬’ থেকে যে পরিমাণ বিকিরণ নির্গত হয়েছে, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের ভেতরে থাকা চৌম্বকীয় সৌরকলঙ্ক বা সানস্পটগুলোর সক্রিয়তা বর্তমানে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে ‘এক্স ৮.১’ (X 8.1) তরঙ্গের প্রলয়ঙ্করী সৌরশিখা। সূর্যের ১১ বছরের একটি চক্র থাকে, যাকে বলা হয় ‘সোলার সাইকেল’। বর্তমানে সূর্য তার সেই চক্রের সর্বোচ্চ সক্রিয় পর্যায়ে বা ‘সোলার ম্যাক্সিমা’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতার কারণেই সূর্যের উপরিভাগে ঘনঘন শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটছে।
সূর্য থেকে আসা এই তীব্র তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ সরাসরি মানুষের শরীরের ক্ষতি না করলেও আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা প্রধানত চারটি ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন:
১. রেডিও ব্ল্যাকআউট: বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উচ্চ কম্পাঙ্কের রেডিও যোগাযোগ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
২. যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: মহাকাশে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলো বিকল হতে পারে। এতে টেলিভিশন সিগন্যাল এবং জিপিএস (GPS) ব্যবস্থায় বড় ধরনের গোলমাল দেখা দিতে পারে।
৩. দিকনির্ণয়ে সমস্যা: জিপিএস বিঘ্নিত হলে সমুদ্রে জাহাজ বা মাঝ আকাশে বিমানে দিকনির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
৪. বিদ্যুৎ বিপর্যয়: শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর পাওয়ার গ্রিডগুলোতে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চাপ তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী ‘ব্ল্যাকআউট’ বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
তবে এই সৌরঝড়ের একটি নান্দনিক দিকও আছে। এর প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর আকাশে মেরুপ্রভা বা ‘অরোরা’র উজ্জ্বলতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কণাগুলো বায়ুমণ্ডলে আঘাত হানলে এর তীব্রতা কতটুকু হবে, তা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।