কেন আবিষ্কার করা হয়েছিল প্রথম এয়ার কন্ডিশনার?

ছাপাখানার কাগজ বাঁচাতে এসে ঘরে রাজত্ব করছে এসি

প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে ঘরে ফিরে এসির রিমোটের বাটনে চাপ দেওয়া মাত্রই জুড়িয়ে যায় প্রাণ। আজ আমাদের কাছে এসি (এয়ার কন্ডিশনার) হলো তীব্র গরম থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

কিন্তু আপনি কি জানেন, মানুষের শরীরকে ঠান্ডা করার জন্য কিন্তু এসি আবিষ্কার করা হয়নি? হ্যাঁ, তথ্যটি একদম সত্য! এসি মূলত তৈরি হয়েছিল মানুষের আরামের জন্য নয়, বরং একটি ছাপাখানার কাগজ আর কালির মান ঠিক রাখার জন্য।

আসুন জেনে নেওয়া যাক এসি আবিষ্কারের সেই চমকপ্রদ ইতিহাস

ঘটনাটি ১৯০২ সালের। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিন এলাকার ‘সাকেট-উইলহেমস লিথোগ্রাফিং অ্যান্ড পাবলিশিং কোম্পানি’ নামের একটি ছাপাখানা বা প্রেস কর্তৃপক্ষ এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়ে। গরমকাল এলেই অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে ছাপাখানার কাগজগুলো ফুলে-ফেঁপে আকারে বড় বা ছোট হয়ে যেত। এর ফলে রঙিন ছবি ছাপানোর সময় রঙের প্রলেপগুলো ঠিকমতো বসত না, কালি লেপ্টে যেত এবং কাগজের মাপ নষ্ট হয়ে যেত।

এই ব্যবসায়িক ক্ষতি থেকে বাঁচতে তারা দ্বারস্থ হয় ‘বাফেলো ফোর্জ’ নামের একটি হিটিং কোম্পানির। সেখানে কর্মরত ছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণ ও প্রতিভাবান প্রকৌশলী—উইলিস হ্যাভিল্যান্ড ক্যারিয়ার (Willis Haviland Carrier)। ছাপাখানার আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাকে একটি উপায় খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

একদিন সন্ধ্যায় পিটসবার্গ ট্রেন স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন উইলিস ক্যারিয়ার। তখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা ছিল। কুয়াশার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তাঁর মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি ভাবলেন, বাতাসকে যদি কৃত্রিমভাবে ঠান্ডা পানির মধ্য দিয়ে চালনা করা যায়, তবে বাতাসের আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পকে ঘনীভূত করে পানি বানিয়ে আলাদা করা সম্ভব। আর বাতাস থেকে আর্দ্রতা কমিয়ে নিলেই ছাপাখানার কাগজ আর নষ্ট হবে না।

এই আইডিয়া থেকেই ১৯০২ সালের ১৭ জুলাই উইলিস ক্যারিয়ার বিশ্বের প্রথম আধুনিক এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের নকশা তৈরি করেন।

ক্যারিয়ারের তৈরি করা সেই প্রথম এসিটির মূল কাজ কিন্তু ঘর ঠান্ডা করা ছিল না। সেটির মূল কাজ ছিল দুটি:

  • বাতাসের আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব নিয়ন্ত্রণ করা।
  • বাতাসের তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় ধরে রাখা।

তবে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দেখা গেল, সিলিন্ডারের ভেতর দিয়ে যে বাতাসটি বের হচ্ছে, সেটি বেশ চমৎকার ঠান্ডা! ফলে ছাপাখানার কাগজ তো ঠিক রইলই, সাথে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরাও এক স্বর্গীয় আরাম অনুভব করতে লাগলেন।

শুরুতে টেক্সটাইল মিল, ওষুধ কারখানা এবং তামাকের গুদামের পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখতে এই এসি ব্যবহার করা হতো। এরপর ১৯০৬ সালে উইলিস ক্যারিয়ার নিজেই তাঁর এই প্রযুক্তির নাম দেন ‘এয়ার কন্ডিশনার’।

মানুষের আরামের জন্য এসি প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ১৯২০-এর দশকে, থিয়েটার বা সিনেমা হলগুলোতে। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরমে সিনেমা হলগুলো ফাঁকা থাকত। তখন হল মালিকরা দর্শকদের টানতে হলে এসি বসানো শুরু করেন। 'শীতল বাতাসের গ্যারান্টি' দেখে মানুষ দলে দলে সিনেমা হলে ভিড় করতে থাকে। এরপর ১৯৩০-এর দশকে অফিস আদালত এবং ১৯৫০-এর দশকে এসে সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে এসির ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সুতরাং, ইতিহাস ঘেঁটে স্পষ্ট দেখা যায় যে—আজ মানুষের জীবন বাঁচানো যে এসি, তা মূলত জন্মেছিল ১৯০২ সালে একটি ছাপাখানার কাগজ আর কালিকে বাঁচানোর তাগিদে! আর এই কারণেই উইলিস ক্যারিয়ারকে বলা হয় ‘এয়ার কন্ডিশনারের জনক’।