মহাকাশও কি একসময় আবর্জনায় ভরে যাবে?

বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার বিস্তার যেমন মহাকাশকে সাধারণ মানুষের নাগালের কাছাকাছি নিয়ে আসছে, তেমনি স্যাটেলাইট ও রকেটের সংখ্যা বাড়ায় পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথ হয়ে উঠছে ক্রমেই ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ

একসময় মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি দেশের নভোচারীদের জন্য। এরপর শুরু হলো বেসরকারি মহাকাশযাত্রার যুগ। বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো মহাকাশকে শুধু গবেষণা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্যিক শিল্প হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে।

জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন, ইলন মাস্কের স্পেসএক্সসহ একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মহাকাশযাত্রার খরচ কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি এবং মানুষের জন্য মহাকাশভ্রমণকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করার চেষ্টা করছে। ব্লু অরিজিনের নিউ শেপার্ড ইতোমধ্যে বহু বেসরকারি যাত্রীকে মহাকাশসীমার ওপরে নিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, নিউ শেপার্ডের মাধ্যমে ৯২ জন পৃথক ব্যক্তি মহাকাশে গেছেন।

কিন্তু মহাকাশে মানুষের প্রবেশ যত সহজ হচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরেকটি প্রশ্ন পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথের ভবিষ্যৎ কী?

কারণ মহাকাশে পাঠানো প্রতিটি রকেট বা মহাকাশযান বর্জ্য তৈরি করে না, আবার প্রতিটি বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রাও নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে (LEO) দীর্ঘদিন অবস্থান করে না। নিউ শেপার্ডের মতো যান মূলত সাব-অরবিটাল ফ্লাইট পরিচালনা করে এবং উড্ডয়নের পর পৃথিবীতে ফিরে আসে। কিন্তু একই সময়ে বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ এবং নিষ্ক্রিয় মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথে জমা হচ্ছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় উদ্বেগ।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) ২০২৬ সালের স্পেস এনভায়রনমেন্ট রিপোর্টে বলেছে, পৃথিবীর কক্ষপথ একটি সীমিত সম্পদ। কিছু কক্ষপথ ইতোমধ্যেই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সেখানে বিকল স্যাটেলাইট ও রকেটের দ্রুতগতির অংশগুলো সক্রিয় মহাকাশযানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ESA-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে পৃথিবীতে ৩০০টির বেশি মহাকাশ উৎক্ষেপণ হয়েছে এবং কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে ৪ হাজারের বেশি নতুন পেলোড। বড় স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন ও একই রকেটে একাধিক স্যাটেলাইট পাঠানোর প্রবণতার কারণে কক্ষপথে বস্তুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে পুরোনো স্যাটেলাইট ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষও জমছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ESA বলছে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে বস্তুর সংখ্যা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি ভবিষ্যতে দ্রুত বাড়তে পারে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে কক্ষপথের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।

মহাকাশের বর্জ্য বা স্পেস জাঙ্ক বলতে সাধারণত মানুষের তৈরি এমন বস্তু বোঝায়, যেগুলো আর কোনো কার্যকর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না কিন্তু পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এর মধ্যে থাকতে পারে নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইট, রকেটের বিভিন্ন অংশ, কোনো মহাকাশযানের বিচ্ছিন্ন অংশ, সংঘর্ষ বা বিস্ফোরণে তৈরি ধ্বংসাবশেষ এমনকি ক্ষুদ্র ধাতব টুকরোও।

আকারে ছোট হলেও এগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। NASA জানিয়েছে, কক্ষপথে ধ্বংসাবশেষের গতি প্রায় ১০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত হতে পারে। ফলে মাত্র এক সেন্টিমিটার আকারের কোনো বস্তু মহাকাশযানে ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে।

NASA-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে ১০ সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে বড় ধ্বংসাবশেষের সংখ্যা অন্তত ২৬ হাজার; এক সেন্টিমিটার বা তার বেশি আকারের বস্তুর সংখ্যা ৫ লাখের বেশি এবং এক মিলিমিটার বা তার বেশি আকারের বস্তুর সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি হতে পারে।

এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সব বর্জ্য শনাক্ত ও ট্র্যাক করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার আকারের বস্তুগুলো অনেক সময় এমন ক্ষতি করতে পারে, যা একটি মহাকাশযানের মিশন ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম।

জেফ বেজোসের নিউ শেপার্ডের মতো সাব-অরবিটাল মহাকাশযাত্রা সরাসরি নিম্নকক্ষপথে দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্য রেখে যায় না। নিউ শেপার্ড পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং এর বুস্টার ও ক্যাপসুল পৃথিবীতে ফিরে আসে। ব্লু অরিজিনও জানিয়েছে, নিউ শেপার্ডের প্রায় ৯৯ শতাংশ শুষ্ক ভর পুনর্ব্যবহার করা হয়।

তবে বিলিয়নিয়ারদের মহাকাশ উদ্যোগ কেবল পর্যটন ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি কোম্পানিগুলো এখন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মহাকাশ স্টেশন এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র ও মঙ্গল মিশনের মতো বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে।

বিশেষ করে নিম্নকক্ষপথে স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন দ্রুত বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে স্পেসএক্সের ২০২৬ সালের একটি নথিতে বলা হয়েছে, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তাদের স্টারলিংক নেটওয়ার্কে প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি স্যাটেলাইট ছিল, যা তখন কক্ষপথে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্যাটেলাইটের প্রায় ৭৫ শতাংশের সমান।

অর্থাৎ মহাকাশ পর্যটনের চেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে বাণিজ্যিক মহাকাশ অবকাঠামোর বিস্তারে।

মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো কেসলার সিনড্রোম।

এর ধারণা হলো, কক্ষপথে বস্তুর ঘনত্ব এত বেশি হয়ে গেলে একটি সংঘর্ষ থেকে নতুন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে। সেই ধ্বংসাবশেষ আবার অন্য স্যাটেলাইট বা মহাকাশযানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে আরও বেশি টুকরো তৈরি করবে। এভাবে একটি সংঘর্ষের পর আরেকটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।

NASA-এর নথিতে এই সম্ভাবনাকে এমন একটি সংঘর্ষ-শৃঙ্খল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথকে ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

এটি কোনো তাৎক্ষণিক ‘মহাকাশ ধ্বংস’ পরিস্থিতি নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি ঝুঁকি। কিন্তু সমস্যা হলো, মহাকাশে একবার বড় ধরনের ধ্বংসাবশেষ তৈরি হলে তা সহজে সরানো যায় না।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, বিভিন্ন দেশের মহাকাশযান এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন সবকিছুকেই কক্ষপথের বর্জ্যের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে নিয়মিত নজরদারি করতে হয়।

একটি ক্ষুদ্র বস্তু যদি ঘণ্টায় কয়েক হাজার কিলোমিটার গতিতে কোনো মহাকাশযানে আঘাত করে, তাহলে সেটি শুধু বাইরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করবে না; গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, সৌর প্যানেল কিংবা চাপযুক্ত অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই কারণেই মহাকাশযানের গতিপথ পরিবর্তন, সংঘর্ষের পূর্বাভাস এবং কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ এখন মহাকাশ মিশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কক্ষপথের সব বর্জ্য চিরকাল মহাকাশে থাকে না। বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণের কারণে অনেক ছোট বস্তু ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে পুড়ে যায়। তবে বড় বস্তু বা নির্দিষ্ট কক্ষপথে থাকা বস্তু দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।

ESA-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতিদিন তিনটির বেশি অক্ষত স্যাটেলাইট বা রকেটের অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করছে। একই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি নতুন পেলোড উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রিত পুনঃপ্রবেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হলেও নিয়ন্ত্রণহীন পুনঃপ্রবেশের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বড় কোনো মহাকাশযানের অংশ পৃথিবীর জনবহুল এলাকায় পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও একেবারে শূন্য নয়।

মহাকাশে যাওয়া বন্ধ করা কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং প্রশ্ন হলো কীভাবে মহাকাশ ব্যবহারের গতি বাড়লেও এর পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নতুন স্যাটেলাইট এমনভাবে তৈরি করা যাতে মিশন শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপদে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, স্যাটেলাইট ও রকেটের অবস্থান সম্পর্কে দেশ ও কোম্পানিগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো। তৃতীয়ত, সংঘর্ষের আগাম সতর্কতা ও কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা।

জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা UNOOSA-র দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের নির্দেশনাতেও মহাকাশযানের অবস্থান ও কক্ষপথের তথ্য ভাগাভাগি, সংঘর্ষের ঝুঁকি মূল্যায়ন, বর্জ্য পর্যবেক্ষণ এবং মিশন শেষে মহাকাশযান অপসারণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতিসংঘের নীতিতে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রগুলো তাদের অধিক্ষেত্রের সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের মহাকাশ কর্মকাণ্ডের জন্য দায়িত্বশীল। অর্থাৎ কোনো বেসরকারি কোম্পানি মহাকাশে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তার কার্যক্রমের ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রয়োজন।

বিলিয়নিয়ারদের মহাকাশযাত্রা মূলত একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতীক। মহাকাশ এখন শুধু রাষ্ট্রীয় মহাকাশ সংস্থার বিষয় নয়; বেসরকারি কোম্পানি, বিনিয়োগকারী, পর্যটক, স্যাটেলাইট অপারেটর এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এই পরিবর্তনের সুফলও আছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের খরচ কমাতে পারে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা সহজ করতে পারে এবং যোগাযোগ ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কিন্তু মহাকাশের জায়গা সীমিত। সেখানে রাস্তা বা আবর্জনা পরিষ্কারের প্রচলিত ব্যবস্থা নেই। একবার কোনো বস্তু কক্ষপথে চলে গেলে সেটিকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।

বিলিয়নিয়ারদের মহাকাশযাত্রা হয়তো মানুষের কল্পনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথকে যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখতে হয়, তাহলে মহাকাশে যাওয়ার প্রতিটি নতুন পদক্ষেপের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সংঘর্ষ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নিয়মকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।