রাতের আকাশে বিশাল লেজার ছুড়ে কৃত্রিম তারা তৈরি করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত ইউরোপীয় দক্ষিণ মানমন্দিরের অতি বৃহৎ দূরবীক্ষণযন্ত্রে এখন নিয়মিতই এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। মহাকাশের আরও নিখুঁত ছবি তুলতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা কাটাতেই এই কৃত্রিম তারা তৈরি করা হচ্ছে।
চিলির পারানালে অবস্থিত অতি বৃহৎ দূরবীক্ষণযন্ত্রের চারটি প্রধান দূরবীক্ষণযন্ত্রই এখন লেজার ছুড়তে সক্ষম। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সর্বশেষ নতুন লেজার স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর পুরো ব্যবস্থায় লেজারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে। একই সময়ে চারটি দূরবীক্ষণযন্ত্রের লেজার একসঙ্গে আকাশে ছোড়ার সক্ষমতাও যুক্ত হয়েছে।
পৃথিবীর মাটিতে স্থাপিত দূরবীক্ষণযন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো বায়ুমণ্ডল। মহাকাশ থেকে আসা নক্ষত্র ও ছায়াপথের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিকৃত হয়। বায়ুমণ্ডলের অবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হওয়ায় নক্ষত্রের আলো দূরবীক্ষণযন্ত্রে স্থির ও তীক্ষ্ণভাবে পৌঁছায় না। ফলে মহাকাশের বস্তুগুলোর ছবি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন অভিযোজিত আলোকবিদ্যা। এর মাধ্যমে দূরবীক্ষণযন্ত্রের একটি বিশেষ আয়না বায়ুমণ্ডলের কারণে আলোর যে বিকৃতি ঘটে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অত্যন্ত দ্রুত নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে। ফলে বিকৃত আলোকে সংশোধন করে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া সম্ভব হয়।
তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে আকাশে একটি উজ্জ্বল ও স্থির আলোকবিন্দু প্রয়োজন। প্রাকৃতিকভাবে এমন উজ্জ্বল তারা সব সময় দূরবীক্ষণযন্ত্রের পর্যবেক্ষণ করা এলাকায় পাওয়া যায় না। তখনই কাজে আসে লেজার।
দূরবীক্ষণযন্ত্র থেকে লেজার আকাশের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে বায়ুমণ্ডলের সোডিয়ামসমৃদ্ধ স্তরের দিকে ছোড়া হয়। লেজারের আলো সেখানে থাকা সোডিয়াম পরমাণুগুলোকে উত্তেজিত করে। এরপর ওই পরমাণু থেকে ফোটন নির্গত হলে দূরবীক্ষণযন্ত্রের আয়নায় তা প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। দূরবীক্ষণযন্ত্র তখন সেই আলোকবিন্দুকে একটি কৃত্রিম তারা হিসেবে ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি পরিমাপ ও সংশোধন করে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমেলিয়া বায়োর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেই সোডিয়ামের উপস্থিতি থাকায় গবেষকেরা আকাশের প্রায় যেকোনো জায়গায় এই কৃত্রিম তারা তৈরি করতে পারেন। এর ফলে প্রাকৃতিক উজ্জ্বল তারার ওপর নির্ভর না করেও দূরবীক্ষণযন্ত্রের অভিযোজিত আলোকব্যবস্থা চালানো সম্ভব হয়।
বর্তমানে ব্যবহৃত লেজারগুলো আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। আগে লেজার স্থিতিশীল রাখতে বিষাক্ত তরল রং ব্যবহারসহ জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো। এখন একটি বোতাম চাপলেই লেজার চালু করা যায় এবং তা পুরো রাত নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির থেকে কাজ করতে পারে।
একেকটি লেজার প্রায় ২২ ওয়াট শক্তি নিয়ে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ব্যাসের আলোকরশ্মি তৈরি করে। এটি সাধারণ লেজার পয়েন্টারের অনুমোদিত সর্বোচ্চ শক্তির তুলনায় প্রায় চার হাজার গুণ বেশি। চারটি লেজার একসঙ্গে ব্যবহার করায় আকাশের আরও বিস্তৃত এলাকায় বায়ুমণ্ডলীয় বিকৃতি সংশোধন করা সম্ভব হয়।
২০২৬ সালে অতি বৃহৎ দূরবীক্ষণযন্ত্রের চারটি প্রধান অংশ, আন্তু, কুয়েন, মেলিপাল ও ইয়েপুন, একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাও পেয়েছে। চারটি দূরবীক্ষণযন্ত্রের বিশাল আয়না সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে গবেষকেরা একটি বৃহৎ ভার্চুয়াল দূরবীক্ষণযন্ত্রের মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন। এতে আগের তুলনায় আরও সূক্ষ্ম মহাজাগতিক বিবরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
এই দূরবীক্ষণযন্ত্র ইতোমধ্যে সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের প্রথম ছবি ধারণ এবং মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরকে প্রদক্ষিণরত পৃথক নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে।
তবে এত শক্তিশালী লেজার ব্যবহারে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আকাশপথে কোনো উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণ এলাকার কাছ দিয়ে গেলে লেজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ লেজারের আলো উড়োজাহাজের পাইলটদের দৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
অর্থাৎ, রাতের আকাশে দেখা ওই বিশাল লেজার আসলে কোনো অস্ত্র বা কল্পবিজ্ঞানের প্রযুক্তি নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি সামলে মহাবিশ্বকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখার জন্যই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে একটি কৃত্রিম তারা জ্বালিয়ে দেন। সূত্র: বিবিসি
বিকল ইঞ্জিন নিয়ে প্রথমবার পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসএক্সের স্টারশিপ
মানুষের মস্তিষ্ক আসলে দুটি পৃথক অঙ্গ!
বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত 'পারমাণবিক ঘড়ি' তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা