পৃথিবী ছাড়া সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রমকারী যান হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার রোবটযান পারসিভারেন্স। ২০২১ সালে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত যানটি ২৮ দশমিক ১ মাইল বা ৪৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে নাসা।
ছয় চাকার গাড়ির আকারের এই রোবটযানটি মঙ্গলে অণুজীবের অস্তিত্বের অনুকূল পরিবেশ অতীতে ছিল কি- না, তা অনুসন্ধানে কাজ করছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে চলা অভিযানে এটি সৌরজগতের অন্যতম প্রাচীন ভূখণ্ডের সন্ধানও চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কর্মকর্তা স্টিভেন লি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, পারসিভারেন্সের প্রকৌশলগত সরঞ্জাম ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এখনো চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। এর বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও সচল আছে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সব ব্যবস্থার মূল্যায়নে দেখা গেছে, রোবটযানটি ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত, এমনকি তার পরও কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হতে পারে।
এর মধ্য দিয়ে ২০০৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মঙ্গলের পৃষ্ঠে ২৮ দশমিক ০৬ মাইল বা প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া নাসার অপর রোবটযান অপরচুনিটির রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে পারসিভারেন্স। দুটি যানই চাঁদের পৃষ্ঠে চলাচল করা যেকোনো রোবটযানের অতিক্রম করা দূরত্বের রেকর্ডও ছাড়িয়েছে।
জেজেরো গহ্বরে অনুসন্ধান
বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত পারসিভারেন্সের অনুসন্ধানের মূল কেন্দ্র মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের জেজেরো গহ্বর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কয়েকশ কোটি বছর আগে অঞ্চলটি পানিতে প্লাবিত ছিল এবং সেখানে একটি হ্রদ ছিল। গহ্বরটির পশ্চিম প্রান্তের কাছের ‘ল্যাক দ্য শার্ম’ নামে পরিচিত অঞ্চল পেরিয়ে ‘ইদুবি’ নামের একটি এলাকার দিকে যাওয়ার পথে রেকর্ডটি গড়ে পারসিভারেন্স। অন্যদিকে, নাসার আরেক রোবটযান কিউরিওসিটি মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছের গেল গহ্বরে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
স্টিভেন লি জানান, পারসিভারেন্সের চলাচলব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, যাতে এটি ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে কি-না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়। পরীক্ষায় এর যন্ত্রপাতিকে ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ চলার সমতুল্য সক্ষমতার মধ্য দিয়েও যাচাই করা হবে। রোবটযানটির সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলের প্রযুক্তি ‘অটোন্যাভ’। লির মতে, পারসিভারেন্সের প্রায় ৯০ শতাংশ যাত্রাই মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন, যানটি সামনের ভূখণ্ডের ত্রিমাত্রিক ছবি ধারণ করে, সফটওয়্যারের সাহায্যে সেই এলাকার ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ বেছে নেয়। দ্রুতগতির বিশেষ কম্পিউটারও এ কাজে সহায়তা করে। ফলে চলার সময় প্রায় অবিরামভাবে ছবি বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ নির্ধারণ করতে পারে এটি।
আগের প্রজন্মের রোবটযানগুলোকে চলাচলের প্রতিটি ধাপের আগে হিসাব-নিকাশের জন্য থামতে হতো। পারসিভারেন্সের প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। লি বলেন, অন্য গ্রহে চলাচলের সক্ষমতা বাড়াতে নাসার আগের চারটি মঙ্গলযান সোজার্নার, স্পিরিট, অপরচুনিটি ও কিউরিওসিটির প্রায় ২৯ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে।
প্রাচীন প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন
লির মতে, পারসিভারেন্সের অন্যতম বড় অর্জন হলো প্রাচীন অণুজীবের অস্তিত্বের সম্ভাব্য চিহ্ন বা ‘বায়োসিগনেচার’ শনাক্ত করা। গত বছর এ আবিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করা হয়। মঙ্গলের একটি নদীখাতে পাওয়া লালচে শিলায় ওই সম্ভাব্য চিহ্নের সন্ধান মেলে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, শিলাটি ৩২০ কোটি থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে তৈরি হয়েছিল। সে সময় নদীখাতটি জেজেরো গহ্বরের হ্রদে পানি সরবরাহ করত।
লির ধারণা, ল্যাক দ্য শার্ম অঞ্চলের ভূখণ্ড থেকে গ্রহের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, বিশেষ করে বড় উল্কাপিণ্ডের আঘাতের প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। মঙ্গলের ইতিহাসের শুরুর দিকে এমনই একটি আঘাতে জেজেরো গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল। স্যাটেলাইটচিত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গহ্বরটির প্রান্তের কিছু এলাকায় একসময় ভূগর্ভস্থ উষ্ণ পানির ব্যবস্থা বা হাইড্রোথার্মাল পরিবেশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
লি বলেন, এসব এলাকায় উষ্ণ পানিসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ পরিবেশ একসময় প্রাণের বিকাশের অনুকূল হতে পারে। কিছু জীবাশ্মবিদের ধারণা, পৃথিবীতেও এমন পরিবেশে প্রাণের সূচনা হয়ে থাকতে পারে। পারসিভারেন্সের মূল অভিযানে ২০ কিলোমিটার পথ চলার পরিকল্পনা ছিল। তবে মঙ্গলের গহ্বরটির প্রান্তবর্তী অঞ্চল অনুসন্ধানের জন্য সম্প্রতি এর অভিযানের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের শেষ দিক পর্যন্ত অনুমোদন দিয়েছে নাসা। লি জানান, রোবটযানটির প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। এতে আরও বহু বছর ব্যবহারের মতো শক্তি অবশিষ্ট রয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স