পানির নিচের ক্যাবল থেকে মার্কিন গোপন সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত অভিযান বাদ যাবে না: ইরান

ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে দেশটির ওপর আবারও সামরিক হামলা চালানো হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্ভাব্য নতুন অভিযানের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ‘ছোট পরিসরে এপিক ফিউরি’ অভিযান চালাতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানির নিচে থাকা যোগাযোগ কেব্‌ল থেকে শুরু করে সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানদের এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হয়তো আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারি, অথবা তারা সমঝোতায় আসবে। তারা বুদ্ধিমান হলে বলবে, চলুন, কাজ শুরু করি।’

তবে নতুন হামলা এড়াতে ইরানকে ঠিক কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে, তা স্পষ্ট করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক বলেছিলেন, চলতি সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলা হতে পারে। পডকাস্টার মারিও নওফালের সঙ্গে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘এই সপ্তাহান্তে হামলা হতে পারে কি? অবশ্যই।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প সমঝোতার জন্য প্রস্তুত এবং কয়েক মাস ধরে আলোচনা চালানোর চেষ্টা চলছে।

তবে ইরানবিষয়ক আলোচনায় ব্যারাকের সরাসরি দায়িত্ব নেই। তাঁর বক্তব্যের পর ট্রাম্প বলেন, ‘ওটা কি আমার রাষ্ট্রদূত? তিনি বেশ ক্ষমতাবান লোক, মনে হয়। যদি তা-ই হয়, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান শিগগিরই হতে পারে বলে মনে করেন ট্রাম্প। ফ্লোরিডার একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, সমঝোতার মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনোভাবে, একভাবে না একভাবে এর অবসান হবে।’

তবে যুদ্ধ শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি তিনি। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে কী ধরনের আলোচনা চলছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত বলেননি।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, আগের প্রশাসনগুলো এই হুমকি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমাকে ইরানে হামলা চালাতেই হতো, নইলে তারা পারমাণবিক অস্ত্র পেয়ে যেত।’

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, আগের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়েছে। এগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য; প্রতিবেদনে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের পানির নিচে থাকা যোগাযোগ কেব্‌ল লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, হামলা হলে যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষতি করার পাশাপাশি কেব্‌ল মেরামতের কাজও বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটতে পারে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানে হামলা হলে আর কোনো সীমারেখা থাকবে না—পানির নিচের কেব্‌ল থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি, এমনকি গোপন ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আগুন নিয়ে খেলা উচিত নয়।’

তবে যোগাযোগ কেব্‌ল লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা সম্পর্কে এ বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়নি। বাস্তবে এমন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ, আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদান এবং ডিজিটাল সেবায় কী মাত্রার প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে ক্ষতির পরিমাণ ও বিকল্প সংযোগব্যবস্থার ওপর।

এদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে দেশটির কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলার প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জে ক্লেটন ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে এ বিষয়ে এক পাতার একটি অশ্রেণিবদ্ধ স্মারকলিপি পাঠান। এতে কিছু প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা উন্নত পর্যায়ে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

তবে স্মারকলিপিতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কোন কোন দেশ ঝুঁকিতে রয়েছে কিংবা ষড়যন্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট ধরন উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে চলতি সপ্তাহে রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস এবং জেদ্দা ও ধাহরানের কনস্যুলেট থেকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন—এমন কর্মীদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, কাতার ও জর্ডানে মার্কিন দূতাবাসগুলোর কর্মীসংখ্যাও কমানো হয়। কূটনীতিকদের কেউ কেউ এই প্রক্রিয়াকে ‘বিশৃঙ্খল’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ট্রাম্পের নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি, ইরানের পাল্টা সতর্কবার্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনৈতিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

একদিকে ওয়াশিংটন সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও বজায় রাখছে। তেহরানও কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট না করে নতুন হামলার ক্ষেত্রে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

তবে চলতি সপ্তাহান্তে সত্যিই নতুন হামলা হবে কি না, কিংবা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত হবে কি না—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

সূত্র: এনডিটিভি ও রয়টার্সের প্রতিবেদন, অ্যাক্সিওসের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অবলম্বনে।