নতুন করারোপ নয়, বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজারের প্রত্যাশা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম বাজেট পেশ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (৬ জুন)। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উত্থাপিত হতে যাচ্ছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট। এই বাজেটে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনসহ নানা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়গুলো উঠে আসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

এরই ধারাবাহিকতায় আসন্ন বাজেট ঘিরে দেশের অন্য সকল খাতের মতো শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরাও চাইছেন এবারের বাজেটে নতুন কোনও কর আরোপ না করে, বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার তৈরিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে। 

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান হাফিজ মুহাম্মদ হাসান বাবু বলেন, বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজার ক্রান্তিকালে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারের ওপর কোনও ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) না দিয়ে যদি নতুন করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তাতে বাজারের ওপর নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি  হবে। এর প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। 

তিনি বলেন, বাজার যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, সেই সময় সরকার বা এনবিআর আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে। 

ডিএসইর চেয়ারম্যান আরও বলেন, শেয়ারবাজারে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত সিকিউরিটিজ লেনদেনের মূল্য পরিশোধকালে ০.০৫ শতাংশ হারে কর সংগ্রহ করে। এ করের হার আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ কর কর্তনের হার হ্রাস করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও করোনা মহামারির প্রভাব বিবেচনা করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এ ধরনের করের হার ০.০৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.০১৫ শতাংশ করা যেতে পারে। লেনদেনের মূল্যের উপর টিডিএস’র হার ০.০৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ০.০২০ শতাংশ করা। উৎসে লভ্যাংশ আয়ের উপর কর সম্পূর্ণ এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসাবে বিবেচনা করা এবং লভ্যাংশ প্রাপ্তির প্রথম পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ছাড়। লভ্যাংশ আয়ের উপর উৎস করকে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর উৎসে কর্তনকৃত করের মতো চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করা। তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেট কর হার হ্রাস করা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেট কর হারে ৭.৫ শতাংশ ব্যবধান রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই ব্যবধান বাড়িয়ে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ করা। তালিকাভুক্ত বন্ড থেকে অর্জিত আয় বা সুদের উপর কর অব্যাহতি। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ লেনদেন থেকে মূলধনী মুনাফার উপর নতুন করে কর আরোপ না করা। এসব দাবি সরকার বিশেষ বিবেচনায় বাস্তবায়ন করলে বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার তথা স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশার কথা বলেন তিনি । 

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বাজার কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শেয়ারবাজারের গুণগত সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য যথাযথ কৌশল নির্ধারণ করে দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

তিনি বলেন, আমরা আশা করি চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় তার সুযোগ্য অর্থমন্ত্রী একটি টেকসই ও গতিশীল বাজেট উপস্থাপন করবেন। একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বাজার কাঠামো তৈরি করার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতীয় বাজেট দেশের জন্য শুধুমাত্র একটি বাৎসরিক আয় ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক নির্দেশনাও বটে। বর্তমান সরকারের কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিতকরণ এবং ২০৪১ সালে একটি উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীতকরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য একটি যথোপযুক্ত অর্থ বাজার কাঠামো তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি টেকসই বাজার কাঠামোর জন্য অর্থ বাজার, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাঠামোর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একইসঙ্গে জাতীয় বাজেটে পুঁজিবাজারের গুণগত সম্প্রসারণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য যথাযথ কৌশল নির্ধারণ করে দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আসিফ ইব্রাহিম বলেন, সিএসইর দেওয়া শেয়ারবাজার উন্নয়ন কৌশলপত্রে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণে সিএসইর প্রস্তাবগুলো হলো- তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি, মার্কেট ক্যাপ জিডিপি রেশিও বৃদ্ধি, কার্যকর কর্পোরেট বন্ড মার্কেট চালুকরণ ও পুঁজিবাজারে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এর মতো উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মাজেদা খাতুন বলেন, আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পলিসি সাপোর্ট দেওয়া। ইতোমধ্যে আমরা ডিএসই, সিএসইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে শেয়ারবাজার নিয়ে আলোচনা করেছি। তারা আমাদের বিষয়গুলো ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। আমরা বলেছি, শেয়ারবাজারের আমাদের কর্পোরেট কর ব্যবধান কমিয়ে আনা, তালিকাভুক্ত অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে কর ব্যবধান বাড়ানো হলে অনেক ভাল কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহী হবে। এছাড়া দ্বৈত কর ব্যবস্থা কমিয়ে আনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আমাদের দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে পড়েছে। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের কাছে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান বিএমবিএর সভাপতি। 

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি একটি বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার। আসন্ন বাজেটে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপ না করা। তালিকাভুক্ত-অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করের ব্যবধান বাড়ানো যাতে ভালমানের কোম্পানিগুলো বাজারে আসে। আর অপ্রদর্শিত অর্থ শেয়ারবাজারের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। যা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারী তথা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে বলে মনে করেন।  

এদিকে শেয়ারবাজারের মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা ও শেয়ারবাজার বান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরিতে যথাযথ মূল্যায়ন সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেছেন পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশন (ক্যাপমিনাফ)। 

সংগঠনটির সভাপতি রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ১২ দফা দাবির কথা জানিয়েছি। এরমধ্যে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। শেয়ারবাজার ভালো করতে আগামী এক বছর সকল ধরনের আইপিও অনুমোদন বন্ধ রাখা, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপ বন্ধ না করা, বাইব্যাক আইন কার্যকর করা, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা তহবিল গঠন করা, স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট পুঁজিবাজার ও স্বচ্ছতা আনয়নে বিএসইসিতে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি রাখার ব্যবস্থা রাখাসহ আসন্ন বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ সম্পূর্ণ নিঃশর্তভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের  দাবি জানান তিনি।