মেসিদের সামনে মিশরের নতুন অস্ত্র হামজা

‘আমরা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলছি, মেসির বিপক্ষে নয়।’ নকআউট পর্বের মহারণের আগে এই একটি বাক্যেই আত্মবিশ্বাসের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন মিশরের তরুণ ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকরিম। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপের নজর কাড়া এই স্ট্রাইকারকে ঘিরে এখন মিশরের বড় স্বপ্ন। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে লিওনেল মেসিদের রক্ষণভাগের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নাম হতে পারেন এই ‘নতুন সালাহ’।

মিশরের সবচেয়ে বড় তারকা অবশ্যই মোহাম্মদ সালাহ। তবে এবার আলোচনায় উঠে এসেছে আরেকটি নাম,হামজা আবদেলকরিম। সম্প্রতি স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া এই তরুণ ইতোমধ্যেই মিশরের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েছেন। অনেকের মতে, চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আবিষ্কারদের একজন তিনি।

সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ না খেলেই বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া হামজা শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে মোহাম্মদ সালাহর বদলি হিসেবে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে অভিষেকও হয়ে গেছে তার। এবার সামনে আরও বড় মঞ্চ, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নকআউট পর্বের লড়াই।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভো-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের মানসিকতা স্পষ্ট করেছেন হামজা। তার ভাষায়, “আমি মাঠে নামলে শুধু নিজের খেলাটাই উপভোগ করি। মাঠের বাইরে কে কী বলছে, তা নিয়ে ভাবি না। আমার পুরো মনোযোগ থাকে ম্যাচের ওপর।”

মিশরের ফুটবলের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচিত এই স্ট্রাইকার নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন মোহাম্মদ সালাহকে। হামজার মতে, “সালাহ শুধু আমার নন, পুরো দলের মেন্টর। তিনি নিয়মিত নিজের অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তার মতো ক্যারিয়ার গড়া অবিশ্বাস্য। তার পাশে থাকা আমার জন্য স্বপ্নপূরণের মতো।”

২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি কায়রোতে জন্ম নেওয়া হামজার ফুটবলযাত্রার শুরু মালয়েশিয়ায়। সে সময় তার বাবা সেখানে ভলিবল কোচ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২০ সালে মিশরের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আল আহলির যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দ্রুত এগোতে থাকে তার ক্যারিয়ার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৭ বছর ১ মাস বয়সে আল আহলির মূল দলে অভিষেক করে চলতি শতাব্দীতে ক্লাবটির সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি।

মিশরের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ২১ ম্যাচে ১২ গোল করে ইউরোপের স্কাউটদের নজর কাড়েন হামজা। ডাচ ক্লাব ফেইনুর্ড তাকে দলে নিতে আগ্রহ দেখালেও আল আহলি নতুন চুক্তিতে তাকে ধরে রাখে। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনা তাকে ধারে বার্সেলোনা ‘বি’ দলে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এই ফরোয়ার্ড।

বার্সেলোনার যুব দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই হেডে হ্যাটট্রিক করে দলকে লিগ শিরোপা জেতান হামজা। এরপর বার্সেলোনা ‘বি’ দলের হয়ে ১১ ম্যাচে ৮ গোল করে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে মুগ্ধ করেন। শেষ পর্যন্ত ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ইউরোর বাই-আউট ক্লজ সক্রিয় করে তাকে স্থায়ীভাবে দলে ভেড়ায় কাতালান ক্লাবটি। বার্সেলোনার মূল দলের কোচ হ্যান্সি ফ্লিকও নিশ্চিত করেছেন, আগামী প্রাক-মৌসুম সফরে হামজা তার পরিকল্পনার অংশ থাকবেন।

মিশরের কোচ হোসাম হাসানও এই তরুণের প্রতিভার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। উইঙ্গারনির্ভর আক্রমণভাগে হামজাই দলের একমাত্র স্বাভাবিক ‘নাম্বার নাইন’। বক্সের ভেতরে তার অবস্থান, হেডে দক্ষতা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর সামর্থ্য মিশরের আক্রমণে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। তবে নকআউট পর্বের ম্যাচে ছোট একটি মুহূর্তও বদলে দিতে পারে পুরো সমীকরণ। সেই অঘটনের আশাতেই তাকিয়ে মিশর। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কেন্দ্রে রয়েছেন এক তরুণ স্ট্রাইকার—হামজা আবদেলকরিম, যিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা, কিন্তু লড়াইটা কেবল একজন মেসির বিপক্ষে নয়।