মেসির বিদায়: আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের স্মরণীয় ছয় মুহূর্ত

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির ২১ বছরের দীর্ঘ যাত্রার অবসান ঘটেছে। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে শেষ করেছেন এমন এক অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল লাল কার্ড দিয়ে; মাঝপথে ছিল একের পর এক ফাইনালে হতাশা, অবসরের ঘোষণা ও প্রত্যাবর্তন। আর শেষটা হয়েছে বিশ্বকাপসহ একাধিক বড় শিরোপা জয়ের গৌরবে।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি। জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের মালিক হিসেবেই তিনি বিদায় নিচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি মুহূর্ত ফিরে দেখা যাক।

অভিষেকেই লাল কার্ড

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। তবে সেই অভিষেক ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই রেফারি তাঁকে লাল কার্ড দেখান।

মাত্র ১৮ বছরের মেসি তখন হয়তো ভাবতেও পারেননি, হতাশাজনক সেই শুরুই একদিন তাঁকে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার করে তুলবে।

২০১৪ বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গ

ব্রাজিল বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। গ্রুপপর্ব থেকে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলকে ফাইনালে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা।

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন মেসি। কিন্তু অধরাই থেকে যায় কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি।

২০১৬-তে অবসরের ঘোষণা

২০১৪ বিশ্বকাপের পর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চিলির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। ২০১৬ সালের ফাইনালে টাইব্রেকারে নিজের পেনাল্টি মিস করার পর ভেঙে পড়েন মেসি।

টানা তিনটি বড় ফাইনালে ব্যর্থতার হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। তবে বেশিদিন দূরে থাকেননি। পরে সিদ্ধান্ত বদলে আবারও জাতীয় দলে ফিরে আসেন।

২০২১-তে অবশেষে বড় শিরোপা

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন মেসি। ব্রাজিলের মাটিতে ফাইনালে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

মেসির জন্য সেই শিরোপা ছিল বিশেষ তাৎপর্যের। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিনের হতাশা ও সমালোচনার পর অবশেষে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি হাতে ওঠে তাঁর।

২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ণতা

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় আসে কাতার বিশ্বকাপে। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোল করেন মেসি। নাটকীয় টাইব্রেকারে জয় পেয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলও পান মেসি। দীর্ঘদিনের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন পূরণ করে পূর্ণতা পায় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

২০২৪-তে আবারও কোপা আমেরিকা

২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বার এই ট্রফি জয়ের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হয় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ও ফাইনালিসিমা এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এই ধারাবাহিক সাফল্যে আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্মের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন মেসি।

রেকর্ডে অনন্য মেসি

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ পরিসংখ্যানও তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষ্য দেয় ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল ও ছয়টি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তাঁর দখলে। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ এবং সর্বোচ্চ গোল দুই রেকর্ডই এখন মেসির।

তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল লাল কার্ড দিয়ে। এরপর এসেছিল একের পর এক ফাইনালে হার, অবসরের ঘোষণা ও প্রত্যাবর্তন। শেষ পর্যন্ত সেই গল্প পূর্ণতা পেয়েছে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ডে।

তাই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়; এটি একটি বর্ণিল যুগের সমাপ্তি।