আর্জেন্টিনায় মেসির শেষ ম্যাচ

মনুমেন্টালে ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষা

দুই দশকের বেশি সময়ের এক অবিশ্বাস্য আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ হতে চলেছে। আগামী ৬ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। ম্যাচটি শুধু আর্জেন্টিনা-বেনিনের একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ হতে যাচ্ছে না; বরং আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ উপস্থিতি, তার আন্তর্জাতিক ফুটবল-জীবনের আনুষ্ঠানিক বিদায়।

বিশ্ব ফুটবলের কোটি কোটি দর্শকের চোখ এখন সেই দিনের দিকে। কারণ মেসির বিদায় মানে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও সফল অধ্যায়গুলোর একটি পর্দা নামার মুহূর্ত। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এএফএ ১৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে, মেসি ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে শেষবারের মতো খেলবেন। ম্যাচটি হবে বুয়েনস আয়ার্সের রিভার প্লেটের মনুমেন্টালে। এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া মেসির জন্য দেশের মাটিতে একটি যথাযথ বিদায়ী আয়োজনের কথা জানিয়েছেন।

বিশ্বকাপের পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে অবশ্য আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ গোলে হারের পর অনেকের ধারণা ছিল, সেটিই হয়তো মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। পরে ৩১ আগস্ট তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা তাকে দেশের সমর্থকদের সামনে বিদায় জানানোর জন্য আরেকটি ম্যাচের ব্যবস্থা করে। ফিফাও ৬ অক্টোবরের ম্যাচটিকে মেসির আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ উপস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড সংখ্যক ম্যাচ খেলেছেন এবং দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার অর্জনের তালিকায় রয়েছে ২০০৮ অলিম্পিক সোনা, ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা এবং সবচেয়ে বড় সাফল্য- ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপ জয়ের সেই অভিযানে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি দলটির সঙ্গে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ অধ্যায়টি আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়ে ঘেরা।

মেসি তার ক্যারিয়ারের বড় একটি অংশ কাটিয়েছেন দেশের বাইরে। ইউরোপে ক্লাব ফুটবল, পরে যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টার মায়ামি সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সামনে তার উপস্থিতি সবসময়ই বিশেষ ঘটনা। আর এবার সেই উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদায়ের আবেগ। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখবে না। তারা দেখবে এমন একজন খেলোয়াড়কে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছেন।

এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া মেসির বিদায়কে তার নিজের দেশে প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ আয়োজনটি শুধু বর্তমান জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ঘিরে নয়; মেসির সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়ের সঙ্গীদেরও আবার এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদায়ের আবেগ ইতিমধ্যেই আরও বাড়িয়েছে মেসির প্রকাশ করা বিশেষ জার্সি।

২২ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে তাঁকে বিশেষভাবে তৈরি আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে দেখা যায়। পোস্টের সঙ্গে তিনি লেখেন- “One last match… A jersey for a lifetime.” বিশেষ জার্সিটিতে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা রঙের নকশা থাকলেও রয়েছে সোনালি রঙের বিশেষ সংযোজন। মেসির নাম ও ১০ নম্বর এবং এএফএ-এর প্রতীক সোনালি রঙে রাখা হয়েছে। জার্সির পেছনে ১০ নম্বরকে ঘিরে সূর্যের রশ্মির মতো নকশা রয়েছে, যা আর্জেন্টিনার জাতীয় প্রতীকের ‘Sun of May’-এর প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।

ফুটবল জার্সি সাধারণত দলের পরিচয় বহন করে। কিন্তু এই জার্সিটি একই সঙ্গে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার ও জাতীয় দলের ইতিহাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। জার্সি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমনও বলা হচ্ছে, এটি মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।

বিশ্বের বহু কিংবদন্তি ফুটবলার জাতীয় দল থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা কয়েকটি কারণে। প্রথমত, তিনি শুধু জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন না, আর্জেন্টিনার একটি প্রজন্মের ফুটবল-পরিচয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল প্রত্যাশার বিপুল চাপ নিয়ে, কিন্তু সেই পথ শেষ হয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে। তৃতীয়ত, মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক একসময় ছিল প্রবল আবেগ ও হতাশার মিশ্রণ। বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে পরপর ব্যর্থতা, ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা সবকিছুর পরও তিনি ফিরে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকার মতো বড় শিরোপা জিতে সেই অধ্যায় বদলে দেন। তাই ৬ অক্টোবরের বিদায় শুধু একজন সফল খেলোয়াড়ের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের একটি পূর্ণচক্রের সমাপ্তি।