ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে গেলেন ফিফা সভাপতি

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মালিকানা বা শেয়ার বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। তবে মরক্কোর রাবাতে আয়োজিত এক জরুরি সভায় ফিফার সিনিয়র নির্বাহীদের সমর্থন পাওয়ায় তিনি ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতির পদেই বহাল থাকছেন।

বিতর্কিত পরিকল্পনাটি সামনে আসার পর সর্বস্তরের সমালোচনার মুখে বুধবার (৫ আগস্ট) মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জরুরি তলব করেন ইনফান্তিনো। বৈঠক শেষ হওয়ার ৪ ঘণ্টার মাথায় ফিফার পক্ষ থেকে একটি সমর্থনসূচক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম—যিনি এই পুরো ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় বলে স্টাফদের কাছে মেমো পাঠিয়েছিলেন—তিনি এবং ব্যবস্থাপনা পর্ষদ বৈঠক শেষে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বেই পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এছাড়া, ইনফান্তিনো এবং গ্রাফস্ট্রম যৌথভাবে ফিফার ভাইস-প্রেসিডেন্ট, কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য সংস্থাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাঁদের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ইনফান্তিনো 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (FFE) নামের একটি নতুন অঙ্গসংস্থানের মাধ্যমে পুরুষ ও নারীদের বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই প্রস্তাব সমর্থন করলে প্রতিটি সদস্য সংস্থাকে ৪০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড) দেওয়ার লোভনীয় অফার দেওয়া হয়। তবে ফিফা স্বীকার করেছে যে, এই পরিকল্পনা তৈরি এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় কাউন্সিল ও সদস্য সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে বড় ভুল করা হয়েছে। দ্য টাইমস পত্রিকায় ২৮ জুলাই প্রথম এই খবরটি ফাঁস হওয়ার পর পরিস্থিতি সামলাতে ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও স্বীকার করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের বিনিময়ে মরক্কোর সমর্থন চান ইনফান্তিনো, তবে ফিফা এই দাবিকে সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইনফান্তিনোর এই পদক্ষেপের পর ইউরোপীয় ফুটবলের গভর্নিং বডি 'উয়েফা' (UEFA) জানায়, তারা ইনফান্তিনোর ওপর থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়েছে এবং এই প্রক্রিয়াকে একটি অস্বচ্ছ ও পেছনের দরজার চুক্তি বলে আখ্যা দিয়েছে। সম্প্রতি সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ইনফান্তিনোর ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, সাবেক তারকা ফুটবলার লুইস ফিগো ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, 'তিনি যে পদটিকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকেই নিচে নামিয়েছেন। তাঁর নিজের মর্যাদা বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেলেও ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনও আছে।' ওয়েলসসহ কয়েকটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা ছিল যে, পুরো প্রক্রিয়াটি ফিফার অভ্যন্তরীণ শীর্ষ কর্মকর্তাদের থেকেও গোপনে রাখা হয়েছিল। এছাড়া, প্রস্তাবিত চুক্তিটির সুবিধাভোগী ছিলেন জোশুয়া কুশনার—যিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ব কৌশল ও গভর্ন্যান্স বিষয়ক ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেছেন। তবে গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ভেঙ্গার ও চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুরের মতো ব্যক্তিত্বরা পদত্যাগ না করে ফিফার অভ্যন্তরে অবস্থান নিয়েছেন।

সব জল্পনা-কল্পনা সত্ত্বেও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদের জন্য সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত। আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম জমা দিতে হবে এবং জয়ের জন্য ২১১টি সদস্যের মধ্যে ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন। ইউরোপের বাইরে কেবল জর্ডান প্রকাশ্যে তাঁর পদত্যাগ দাবি করলেও, এশিয়া ও আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ এখনও ইনফান্তিনোর পক্ষে রয়েছে। বিশেষ করে মিশর, মরক্কো, নাইজার, ডিআর কঙ্গো ও ফিলিপাইন ইনফান্তিনোর অনুদান কর্মসূচির (ফিফা ফরোয়ার্ড) আর্থিক সুবিধা পাওয়ায় তাঁর প্রতি অনুগত রয়েছে।

তবে উয়েফার শক্ত অবস্থান এবং আইনি ব্যবস্থার হুমকির মুখে ইনফান্তিনোকে ফিফার নিয়মনীতি সংস্কার ও স্বচ্ছতা প্রমাণের নতুন পথ খুঁজতে হবে। ফিফা জানিয়েছে, ভুল হলেও সব কার্যক্রম ফিফার নিয়ম মেনেই করা হয়েছিল এবং এই বৈঠকের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ফিফার সুশাসন ও আস্থার জায়গা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

সূত্র: বিবিসি