প্রতি বছর ১৭ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় সেন্ট প্যাট্রিকস ডে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো নদী সবুজ রঙে রাঙানো থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক, সিডনি, প্যারিস কিংবা মিউনিখে জমকালো শোভাযাত্রা- সবখানেই উৎসবের আমেজ থাকে তুমুল। তবে উত্তর আয়ারল্যান্ডে এই দিনটি উদযাপনের এক ভিন্ন ও শান্ত পথও রয়েছে-হাঁটা।
সেন্ট প্যাট্রিকস ওয়ে নামের একটি দীর্ঘ হাঁটার পথ এই উদযাপনের কেন্দ্র। প্রায় ৮২ মাইল দীর্ঘ এই ট্রেইলটি আর্মাঘ থেকে শুরু হয়ে ডাউনপ্যাট্রিকে গিয়ে শেষ হয়েছে, যেখানে আয়ারল্যান্ডের পৃষ্ঠপোষক সাধু সেন্ট প্যাট্রিকের সমাধি অবস্থিত।
২০১৫ সালে এই পথচলার ধারণা বাস্তবায়িত হয়। স্পেনের বিখ্যাত তীর্থপথ কামিনো দে সান্তিয়াগো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ট্রেইল তৈরি করা হয়। ডাউনপ্যাট্রিকের সেন্ট প্যাট্রিকস সেন্টারের পরিচালক টিম ক্যাম্পবেল বলেন, সেন্ট প্যাট্রিকস ডে বিশ্বের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও অনেক সময় সেই উৎসবে প্যাট্রিকের আসল গল্প হারিয়ে যায়। এই পথচলার লক্ষ্য সেই গল্পকে আবার সামনে আনা।
সেন্ট প্যাট্রিকের জীবনও প্রচলিত কিংবদন্তির চেয়ে অনেক বেশি জটিল। চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি রোমান ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সে আইরিশ দস্যুরা তাকে অপহরণ করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। পরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে যান এবং পরবর্তীতে মিশনারি হিসেবে আবার আয়ারল্যান্ডে ফিরে আসেন।
তার এই জীবনগাঁথা আজও অনেককে অনুপ্রাণিত করে। সাবেক এক সংবাদকর্মী মার্টিনা পার্ডি, যিনি পরে সন্ন্যাসিনী হন এবং এখন সেন্ট প্যাট্রিকস ওয়ে-তে ধ্যানমূলক হাঁটার নেতৃত্ব দেন, বলেন- প্যাট্রিকের গল্প আজকের সময়ের সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। একজন তরুণের অপহরণ, দাসত্ব এবং পরে নতুনভাবে জীবন গড়ে তোলার কাহিনি মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
এই পথচলা শুরু হয় আর্মাঘ শহর থেকে, যেখানে দুটি সেন্ট প্যাট্রিক ক্যাথিড্রাল- একটি রোমান ক্যাথলিক এবং অন্যটি চার্চ অব আয়ারল্যান্ড- দুটি পাহাড়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এটি আয়ারল্যান্ডের বিভক্ত ইতিহাস ও যৌথ ঐতিহ্যের এক প্রতীক।
পথটি এরপর দক্ষিণের ফলবাগানঘেরা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, যেখানে সাইডার ও আপেল পাইয়ের জন্য এলাকা বিখ্যাত। বানব্রিজ শহর অতিক্রম করে এটি নিউরি খাল ধরে এগিয়ে যায় নিউরি শহরের দিকে। এখানকার প্রতীকচিহ্নে সেন্ট প্যাট্রিকের দুই পাশে ইউ গাছ দেখা যায়, যেগুলো তিনি নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
এই পুরো পথের অনেক অংশ আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সীমান্তের কাছাকাছি, যেখানে একসময় সংঘাতের কারণে ভ্রমণ ছিল প্রায় অসম্ভব। শান্তি চুক্তির পর এই ট্রেইল উত্তর আয়ারল্যান্ডের পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নিউরি থেকে পথটি নিরিবিলি গ্রামীণ রাস্তা ধরে চলে গেছে কারলিংফোর্ড উপসাগরের দিকে। উপকূলীয় ছোট শহর রসট্রেভর পাহাড়ঘেরা সুন্দর এক জায়গা, যা লেখক সি এস লুইসের প্রিয় অবকাশস্থল ছিল। মর্ন পর্বতমালার বরফঢাকা দৃশ্য থেকেই তিনি নাকি কল্পনা করেছিলেন তার বিখ্যাত কল্পলোক নার্নিয়ার অনেক দৃশ্য। সূত্র: বিবিসি