মানুষের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস ধারণার চেয়েও বহু পুরোনো হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে বসবাসকারী শিকারি-সংগ্রাহকরা নিয়মিতভাবে এক ধরনের মাদকপ্রভাব সৃষ্টিকারী উদ্ভিদজাত উপাদান ব্যবহার করতেন।
গবেষকদের মতে, প্রাচীন মানুষের দাঁতের অবশেষ বিশ্লেষণ করে এমন কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে সুপারি চিবানো বা চোষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুপারি বা বেটেল নাট (areca nut)-এ রয়েছে ‘অ্যারেকোলিন’ নামের একটি সাইকোঅ্যাকটিভ বা মস্তিষ্কে প্রভাব বিস্তারকারী রাসায়নিক। গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়েছে বুধবার Science Advances জার্নালে।
গবেষকদের দাবি, এটি এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া কোনো নিউরোঅ্যাকটিভ উদ্ভিদজাত মাদকের নিয়মিত ব্যবহারের সবচেয়ে পুরোনো প্রমাণ।
দাঁতের ক্ষয় থেকে মিলল সূত্র
প্রাচীন মানুষের দাঁতের ওপর বিশেষ ধরনের ক্ষয়ের চিহ্ন গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পুরো সুপারি বারবার চোষার ফলে দাঁতে যে ধরনের ঘর্ষণ ও ক্ষয় তৈরি হওয়ার কথা, দাঁতের অবশেষে তার সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
শুধু দাঁতের ক্ষয় নয়, রাসায়নিক বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। দাঁতের টিস্যুতে অ্যারেকোলিনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এর ফলে ওই মানুষরা সুপারি গ্রহণ করতেন—এমন ধারণার পক্ষে আরও একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, এই অভ্যাসের সূচনা প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে। পরবর্তী সময়ে শেষ প্লাইস্টোসিন যুগ পর্যন্ত এই ব্যবহার অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ কৃষির উদ্ভব এবং মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলারও কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই কিছু শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের অভ্যাস ছিল।
কী এই সুপারি?
বেটেল নাট বা অ্যারেকা নাট পাওয়া যায় অ্যারেকা পাম গাছে। এতে থাকা অ্যারেকোলিন একটি সাইকোঅ্যাকটিভ উপাদান, যা শরীরে উদ্দীপক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান সময়েও এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সুপারি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পানপাতা ও অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে বেটেল কুইড হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তবে আধুনিক সময়ে সুপারি ব্যবহারের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। নতুন গবেষণাটির মূল বিষয় অবশ্য বর্তমান স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং মানুষের প্রাচীন ইতিহাসে সাইকোঅ্যাকটিভ উদ্ভিদ ব্যবহারের সময়কাল কতটা পুরোনো, সেটি অনুসন্ধান করা।
দাঁতের ব্যথা কমাতেই কি শুরু?
গবেষকেরা মনে করছেন, প্রাচীনকালে সুপারি ব্যবহারের পেছনে সম্ভবত চিকিৎসাগত একটি কারণও থাকতে পারে।
অ্যারেকোলিনের ব্যথা কমানোর কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যদিকে গবেষণায় বিশ্লেষণ করা প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের দাঁতের স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল না। ফলে শক্ত সুপারি চোষার মাধ্যমে দাঁতের ব্যথা থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা তারা করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
তবে দীর্ঘদিন এই অভ্যাস বজায় রাখার নেতিবাচক প্রভাবও ছিল। শক্ত ও ঘর্ষণকারী সুপারি দাঁতের ওপর ব্যাপক ক্ষয় তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দাঁতের ভেতরের পাল্প বা স্নায়ু-রক্তনালির অংশ পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে পরবর্তী সময়ে ব্যথা আরও বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ যে উপাদান হয়তো প্রথমদিকে দাঁতের ব্যথা কমাতে ব্যবহৃত হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদে সেটিই দাঁতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কৃষির আগেও ছিল মাদক ব্যবহারের অভ্যাস
গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাইকোঅ্যাকটিভ উদ্ভিদ ব্যবহারের সঙ্গে কৃষিভিত্তিক সমাজের উত্থানের সম্পর্কটি নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এতদিন মানুষের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কৃষির বিকাশ, স্থায়ী বসতি এবং জটিল সামাজিক কাঠামোর কথা গুরুত্ব পেত। কিন্তু সুলাওয়েসির এই প্রমাণ দেখাচ্ছে, কৃষি ও স্থায়ী বসতির বহু আগেও কিছু শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে নিয়মিতভাবে নিউরোঅ্যাকটিভ উদ্ভিদ ব্যবহার করা হতে পারে।
গবেষকেরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণা থেকে মানুষ ঠিক কবে প্রথম মাদক ব্যবহার শুরু করেছিল, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বরং গবেষণাটি এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে এমন একটি উদ্ভিদজাত নিউরোঅ্যাকটিভ পদার্থের অভ্যাসগত ব্যবহারের সময়কাল সামনে এনেছে।
ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসা, ব্যথা মোকাবিলা এবং চেতনাকে প্রভাবিতকারী উদ্ভিদ ব্যবহারের ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে শিকারি-সংগ্রাহক মানুষের জীবনেও যে এ ধরনের উদ্ভিদের ব্যবহার ছিল, সুলাওয়েসির দাঁতের ক্ষয় ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ তারই প্রাচীনতম প্রমাণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।