মিললো ৬ কোটি ৫০ লাখ বছরের ইতিহাস

ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর বাদুড়ের উত্থান

ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর পৃথিবীতে বাদুড়ের আবির্ভাব কিভাবে হয়েছিল, তার বিবর্তনীয় ইতিহাসের নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণা বলছে, প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে ইউরোপে বাদুড়ের প্রথম আবির্ভাব ঘটে। পরে সেখান থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই উড়ন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদুড়ের জিনগত তথ্য ও জীবাশ্ম নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সমন্বিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা ২১টি স্বীকৃত বাদুড় পরিবার থেকে ১০৩টি প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এর সঙ্গে ৪৪টি জীবাশ্ম বাদুড়ের তথ্য মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে বাদুড়ের বিবর্তনের একটি পারিবারিক বৃক্ষ। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং ডাইনোসরসহ বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়। এর প্রায় ১০ লাখ বছর পর ইউরোপে বাদুড়ের আবির্ভাব ঘটে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এরপর তুলনামূলক দ্রুতই বাদুড় আফ্রিকায় পৌঁছে যায়। গবেষকদের মতে, ইউরোপ ও আফ্রিকা বাদুড়ের প্রাথমিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই বাদুড়ের দেখা মেলে। আজ পৃথিবীতে ১ হাজার ৫০০টির বেশি বাদুড়ের প্রজাতি রয়েছে। বিশ্বের স্তন্যপায়ী প্রাণীর মোট প্রজাতির এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি বাদুড়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাদুড় ফুলের পরাগায়ন করে, বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং বিপুলসংখ্যক পোকামাকড় খেয়ে থাকে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাদুড়ের বিবর্তনের একেবারে শুরুর দিকেই উড্ডয়ন ও প্রতিধ্বনি শনাক্ত করার ক্ষমতা বা ইকোলোকেশন তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইকোলোকেশনের মাধ্যমে বাদুড় উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে এবং সেই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে অন্ধকারে আশপাশের পরিবেশ বুঝতে পারে। গবেষকদের মতে, উড়তে পারা এবং ইকোলোকেশনের ক্ষমতা বাদুড়কে রাতে সক্রিয় হওয়ার বিশেষ সুবিধা দেয়। ফলে দিনের বেলায় সক্রিয় পাখিদের সঙ্গে খাবার ও পরিবেশের জন্য প্রতিযোগিতা কমে যায়। একই সঙ্গে অন্ধকারে উড়ে শিকার ধরার সুযোগও তৈরি হয়।

বাদুড়ের সবচেয়ে পুরোনো পরিচিত জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বছর। তবে জিনগত ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বাদুড়ের উৎপত্তির সময় আরও পেছনে, প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে নির্ধারণ করেছেন। তবে বাদুড়ের পূর্বপুরুষ দেখতে কেমন ছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। গবেষকদের একজনের ধারণা, তারা হয়তো গাছচর ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো দেখতে ছিল এবং ধীরে ধীরে তাদের আঙুল লম্বা হয়ে উড়তে সক্ষম হয়েছিল। তবে এটি এখনো একটি অনুমান।

উড়তে পারার ক্ষমতা আগে নাকি ইকোলোকেশন, কোনটি আগে বিকশিত হয়েছিল সেটিও এখনো অমীমাংসিত। কারণ সবচেয়ে পুরোনো বাদুড়ের জীবাশ্মগুলোতেই উড্ডয়ন ও ইকোলোকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও পুরোনো ‘প্রি-ব্যাট’ বা বাদুড়ের পূর্ববর্তী প্রাণীর জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

বাদুড় শুধু বিবর্তনের দিক থেকেই নয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘায়ুর কারণেও বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আকারের তুলনায় অনেক বাদুড় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখায়। বাদুড়ের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভবিষ্যতের গবেষণা মানুষের বয়সজনিত পরিবর্তন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণাতেও কাজে আসতে পারে।

বর্তমানে বাদুড়ের আকার ও খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়। ফিলিপাইনের জায়ান্ট গোল্ডেন-ক্রাউনড ফ্লাইং ফক্সের ডানার বিস্তার প্রায় ১ দশমিক ৭ মিটার। অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে পাওয়া বাম্বলবি ব্যাটের ডানার বিস্তার মাত্র প্রায় ১৩ সেন্টিমিটার। কোনো বাদুড় পোকামাকড় খায়, কোনোটি ফল বা ফুলের মধু খায়, আবার কিছু প্রজাতি মাছও খায়। ভ্যাম্পায়ার বাদুড় রক্ত খাওয়ার জন্য পরিচিত। কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বাদুড় আজ পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যময় স্তন্যপায়ী প্রাণীগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।