বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। তবু খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী স্থলজ প্রাণী হিসেবে পরিচিত অ্যালডাব্রা জায়ান্ট কচ্ছপ ‘জোনাথন’-কে নিয়ে গবেষণা করে দীর্ঘ জীবনের রহস্যের কিছু সম্ভাব্য সূত্র পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোনাথনকে ১৮৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নিয়ে আসা হয়। ধারণা করা হয়, সে সময়ও কচ্ছপটি পূর্ণবয়স্ক ছিল। বর্তমানে দ্বীপটির গভর্নরের বাসভবন প্ল্যানটেশন হাউসের একটি ঘেরের মধ্যে বসবাস করছে সে।
বিজ্ঞানীরা জোনাথনের জিনোম ও এপিজিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এপিজিনোম হলো জিনের ওপর থাকা রাসায়নিক চিহ্ন, যা কোন জিন সক্রিয় হবে আর কোনটি নিষ্ক্রিয় থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় জোনাথনের জিনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে ডিএনএ মেরামত, কোষের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্রম, ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ এবং টেলোমিয়ার বা ক্রোমোজোমের প্রান্তের সুরক্ষামূলক অংশের কার্যক্রম।
গবেষকেরা জোনাথনের এপিজিনোম আরও চারটি অ্যালডাব্রা জায়ান্ট কচ্ছপের সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের বয়স ছিল শাবক থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক পর্যন্ত। গবেষণায় দেখা যায়, জোনাথনের ডিএনএর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে বয়সজনিত রাসায়নিক পরিবর্তনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। এসব অংশের অনেকগুলোই এমন জিন নিয়ন্ত্রণ করে, যেগুলো দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকেরা জোনাথনের শরীরে এমন ২৮৭টি জিন শনাক্ত করেছেন, যেগুলোর কিছু পরিবর্তন অন্য কচ্ছপগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি। এর মধ্যে কয়েকটি জিন টিউমার দমন ও ডিএনএ মেরামতের সঙ্গে যুক্ত। জোনাথনের শরীরে এমন একটি জিনের অতিরিক্ত কপিও রয়েছে, যা বয়সজনিত ও ক্যানসার আক্রান্ত কোষ শনাক্ত করতে সহায়তা করে এমন একটি প্রোটিন তৈরি করে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু জোনাথনকে নিয়ে গবেষণা হওয়ায় এসব বৈশিষ্ট্যই তার দীর্ঘ জীবনের একমাত্র কারণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। গবেষণাটিতে একটি মাত্র অত্যন্ত বয়স্ক কচ্ছপকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাই একই বৈশিষ্ট্য অন্য দীর্ঘজীবী কচ্ছপের মধ্যেও রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
জোনাথনের দীর্ঘ জীবনে পরিবেশও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। উষ্ণ দ্বীপের পরিবেশ, নিয়ন্ত্রিত খাবার এবং প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসকদের নিয়মিত যত্ন তার দীর্ঘায়ুতে সহায়ক হয়ে থাকতে পারে। গবেষকদের মতে, জোনাথনের শরীরে পাওয়া কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দীর্ঘজীবী মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণারও মিল রয়েছে। বিশেষ করে কোষের শক্তি উৎপাদনে মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে পাওয়া তথ্য দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে প্রাণী ও মানুষের মধ্যে কিছু সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।
বর্তমানে জোনাথন প্রায় অন্ধ। চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টিশক্তি অনেকটাই হারিয়েছে। তবে তার ক্ষুধা এখনও প্রবল। দীর্ঘদিনের চিকিৎসক জো হলিন্সের ভাষায়, এখন সে এক ‘শান্ত দৈত্য’। জোনাথন শুধু দীর্ঘজীবী একটি প্রাণীই নয়, সেন্ট হেলেনা দ্বীপের মানুষের কাছেও সে একটি পরিচিত প্রতীক। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী এই কচ্ছপ। বিজ্ঞানীদের কাছে তার শরীর এখন বয়স ও দীর্ঘায়ুর রহস্য বোঝার এক অনন্য গবেষণার সুযোগ।