প্রায় দুই হাজার বছর আগে স্কটল্যান্ডের রোমান সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাস করতেন ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। কেমন ছিল তার চেহারা, কোথা থেকে এসেছিলেন তিনি, আর কীভাবে কেটেছিল তার জীবন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কঙ্কালের অবশেষ বিশ্লেষণ করে তার মুখাবয়বের ডিজিটাল পুনর্গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষা, হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ ও মুখাবয়ব মডেলিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই পুনর্গঠন করা হয়েছে। তার প্রকৃত মাথার খুলির পাশাপাশি পুনর্গঠিত মুখাবয়বটি আগামী মাসে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব স্কটল্যান্ডে প্রদর্শন করা হবে। ‘রোমান স্কটল্যান্ড: লাইফ অন দ্য এজ অব এম্পায়ার’ শীর্ষক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে দর্শনার্থীরা এটি দেখতে পারবেন।
ন্যাশনাল মিউজিয়ামস স্কটল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক ও রোমান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান কিউরেটর ড. ফ্রেজার হান্টার বলেন, রোমান ইনভেরেস্ক এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে তিনি বহু বছর ধরে কাজ করছেন। তবে এই মুখাবয়ব পুনর্গঠন প্রথমবারের মতো তাকে ওই এলাকার একজন বাসিন্দার চেহারা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব আমাদের এমন মানুষদের কথা জানায়, যাদেরও আমাদের মতো আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভয় ছিল। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অতীতের একজন বাসিন্দার সম্ভাব্য চেহারা মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়।
গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ওই ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সম্ভবত পঞ্চাশের কোঠার শুরুর দিকে ছিলেন। তার মৃত্যু হয়েছিল আনুমানিক ১৪০ থেকে ১৬৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। তার দেহাবশেষ পাওয়া গেছে আধুনিক এডিনবরার কাছাকাছি ইনভেরেস্ক এলাকায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- ডিএনএ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিনি স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেননি। তার শৈশব কেটেছিল দক্ষিণ ব্রিটেনে। সেখান থেকে কয়েকশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তিনি উত্তরে ফার্থ অব ফোর্থ উপকূলীয় অঞ্চলে এসেছিলেন। কেন তিনি এত দূর এসেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তার দেহাবশেষ গবেষকদের সামনে প্রাচীন ব্রিটেনে মানুষের চলাচল, বসতি এবং রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জীবনযাপনের ইতিহাস জানার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
কঙ্কাল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা তার শারীরিক অবস্থারও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তার নাক একসময় ভেঙেছিল, যদিও পরে তা জোড়া লেগেছিল। ডান কনুইয়ের কাছে হাড়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া গেছে, যা সেপটিক আর্থ্রাইটিসের কারণে হয়ে থাকতে পারে। এই সমস্যার ফলে তার ডান হাতের নড়াচড়া অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছিল। গবেষকদের ধারণা, পুরোনো আঘাত ও হাতের সীমাবদ্ধতার কারণে তার পক্ষে তলোয়ার চালানো কঠিন ছিল। সে কারণে তাকে সৈনিক হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে তিনি ঠিক কী কাজ করতেন, কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন কিংবা ইনভেরেস্কে কেন এসেছিলেন এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে রহস্যময় দিক হলো- সমাধিস্থ করার আগে নয়, বরং মৃত্যুর পর ওই ব্যক্তির মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করছেন। ইনভেরেস্কের একটি রোমান দুর্গের কাছে কয়েকজন পুরুষকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেখানে পাওয়া ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে চারজনেরই মৃত্যুর পর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। তাদের একজন এই ব্যক্তি।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ব্রিটেনে মৃত্যুর পর শিরশ্ছেদের এত প্রাচীন নিদর্শন অত্যন্ত বিরল। স্কটল্যান্ডে এ ধরনের প্রথম নিদর্শন হিসেবেও আবিষ্কারটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কেন তাদের মৃত্যুর পর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি গবেষকেরা। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, কোনো সাংস্কৃতিক আচার কিংবা মৃত্যুকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কারের কথা বিবেচনা করছেন। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায়, এটি শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকাহিনি নয়; বরং রোমান আমলে স্কটল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মৃত্যু, সমাধি এবং সামাজিক রীতিনীতির ইতিহাস বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
বিজ্ঞানের সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন
ন্যাশনাল মিউজিয়ামস স্কটল্যান্ডের অস্থি-প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর ড. জেস থম্পসন বলেন, ইনভেরেস্কের সমাধিগুলো রোমান স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত বিরল নিদর্শন। তার মতে, মানবদেহাবশেষ বিশ্লেষণে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক শাখার সমন্বয় ঘটালে ব্যক্তিদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রা ও অতীতের নানা দিকও জানা সম্ভব হয়। তারা কোথা থেকে এসেছিলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কী করতেন এবং তাদের জীবনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা যায়।
বিশেষজ্ঞ ক্রিস রাইনের তৈরি মুখাবয়বটি আধুনিক বিজ্ঞান ও শিল্পকলার সমন্বয়ে অতীতের একজন মানুষের সঙ্গে বর্তমানের দর্শনার্থীদের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ডিজিটাল পুনর্গঠনটি ওই ব্যক্তির প্রকৃত চেহারার হুবহু প্রতিরূপ নয়। বরং কঙ্কাল, ডিএনএ এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে তার সম্ভাব্য চেহারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রায় দুই হাজার বছর আগের এই মানুষের মুখাবয়ব এখন নতুন করে ইতিহাসের সামনে হাজির হচ্ছে। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর পর শিরশ্ছেদের রহস্য মনে করিয়ে দিচ্ছে- প্রাচীন মানুষের জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে জানার এখনও অনেক কিছু বাকি।
সূত্র: স্কাই নিউজ