চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) বিভিন্ন বিভাগের শ্রমিক ও কর্মচারীদের নিয়ে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) একটি জরুরি সভা আহ্বান করেছে। তবে শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, প্রশাসনের প্রতি চরম অনাস্থা ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে শ্রমিকরা এই সভায় বসতে রাজি নন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ইস্যু করা এক দাফতরিক চিঠিতে দেখা যায়, বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২০০ সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিককে আগামীকাল (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জরুরি সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিপিএ সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে সকল বিভাগীয় প্রধানকে নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে বিভাগভিত্তিক উপস্থিতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে— পরিবহন বিভাগ থেকে ৫০ জন, মেকানিক্যাল বিভাগ থেকে ৮০ জন, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে ২০ জন করে, অর্থ ও হিসাব বিভাগ থেকে ১৫ জন, পরিদর্শন বিভাগ থেকে ৫ জন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক শাখা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধি। এ ছাড়া প্রধান কল্যাণ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ক্যাটাগরি থেকে আরও ১০০ জন মনোনীত শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে ‘জরুরি বিষয়’ নিয়ে আলোচনার জন্য এই সভা ডাকা হয়েছে এবং এই আদেশ কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সভার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থাকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।
তবে কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না শ্রমিক নেতারা। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, বিভাগ অনুযায়ী সংখ্যা নির্ধারণ করে বেছে বেছে শ্রমিকদের ডাকা প্রকৃত সংলাপের লক্ষণ নয়। শ্রমিকরা মনে করছেন, এখানে আলোচনার চেয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাই বেশি।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই সভায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সকল-শ্রমিক-কর্মচারীকে সভায় যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।
এই জরুরি সভা এমন এক সময়ে ডাকা হয়েছে। যখন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে উত্তাল বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ দুই দিনের বিরতি শেষে রোববার সকাল থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে টানা ছয় দিনের ধর্মঘটে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা দেশের বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আলোচনার পর ধর্মঘট দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। তবে শ্রমিক নেতাদের হুঁশিয়ারি ছিল, এনসিটি লিজ চুক্তি বাতিল না হলে তারা পুনরায় আন্দোলনে নামবেন।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে। আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে বদলি এবং তদন্ত শুরু করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একে ‘প্রতিশোধমূলক ও উসকানিমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, যে কোনো আলোচনার আগে বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং এনসিটি লিজ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তা না হলে শ্রমিকরা আলোচনার কোনো যৌক্তিকতা দেখছে না।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা দ্বন্দ্বে বন্দরের উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় বাণিজ্য প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেই এই সভার আয়োজন করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ।
তবে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত সভার কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যাজেন্ডা প্রকাশ করা হয়নি এবং শ্রমিকদের বর্জনের ঘোষণায় শেষ পর্যন্ত সভাটি অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।