হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণায় ১০০ ডলার ছাড়ালো তেলের দাম

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক তেলের বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এক দিনেই ৯ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। 

শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে তেলের দাম আরও বেড়ে ১০১.১৩ ডলারে পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি বাজারে নজিরবিহীন সংকট দেখা দেবে।

তেলের দামের এই সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি কঠোর ঘোষণা। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যকরভাবে বন্ধ রাখা হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে খামেনির পক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সমুদ্রপথটি একটি ‘লিভার’ বা হাতিয়ার, যা ইরানের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহার অব্যাহত থাকবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি লিখেছেন, ‘তেলের দাম বাড়ার চেয়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্য এবং পেন্টাগনের ধীরগতি সম্পন্ন উদ্ধার তৎপরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালী পার হতো। এখন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫টিতে দাঁড়িয়েছে, যার অধিকাংশই চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যুদ্ধের গত কয়েক দিনে অন্তত ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ছায়া স্পষ্ট হচ্ছে। আজ সকালে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলো—টোকিও, সিউল এবং হংকংয়ে বড় ধরণের দরপতন হয়েছে। এর আগে ওয়াল স্ট্রিটেও বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আদি ইমসিরোভিচ বলেন, ‘এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় তেলের ব্যবসায়ীরা সুড়ঙ্গের শেষে কোনো আলো দেখতে পাচ্ছেন না।’

মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, পেন্টাগন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নৌ-পাহারা (Navy Escort) দেওয়ার কথা ভাবলেও তা মাসের শেষের আগে শুরু করা সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।