বাংলাদেশে সাধারণ জীবনযাত্রায় বাংলা সন ও খ্রিষ্টীয় সন অনুসরণ করা হলেও দেশের সব ধরনের সরকারি আর্থিক হিসাব-নিকাশ গণনা করা হয় জুলাই মাস থেকে। প্রতি বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর ধরে দেশের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও পেশ করা হয়। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান সময় পর্যন্ত এই জুলাই-জুন ভিত্তিক অর্থবছর অনুসারেই বাজেট প্রস্তুত করার ঐতিহাসিক রেওয়াজ চলে আসছে।
বছরের অন্য সব মাস বাদ দিয়ে কেন জুলাই মাসকেই অর্থবছরের শুরু হিসেবে বেছে নেওয়া হলো -
সাধারণত যেকোনো স্বাধীন দেশের আবহাওয়া, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নানাবিধ সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে অর্থবছরের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জুলাই মাসটি মূলত বর্ষা মৌসুমের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে পড়ে। এই সময়ে দেশের কৃষকদের জমিতে প্রধান ফসল থাকে এবং তার কয়েক মাস পরেই তা কৃষকের ঘরে ওঠে। আবার দেশের কিছু নিচু অঞ্চলে এর মধ্যেই আগাম ফসল কাটা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে বছরের এই বিশেষ সময়টি গ্রামীণ কৃষিখাতের প্রকৃত চাহিদা, উৎপাদন ও সম্ভাবনা নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করে বাজেট-সংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মূলত কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় কৃষিব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই যুগে যুগে জুলাই থেকে অর্থবছর নির্ধারণের এই ঐতিহ্যবাহী প্রথা চালু রাখা হয়েছে।
এই অর্থনৈতিক পঞ্জিকার পেছনে শুধু কৃষি নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও কাজ করে। দেশের রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, সাধারণত বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তারা পরবর্তী বাজেট প্রণয়নের জন্য হাতে প্রায় ৪ থেকে ৫ মাস পর্যাপ্ত সময় পায়। এই দীর্ঘ সময়ে নতুন সরকার দেশের সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের দেওয়া নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিফলন বাজেটে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার একটি বড় সুযোগ পায়।
দেশীয় বাস্তবতার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য পশ্চিমা উন্নত দেশের অর্থবছরের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখাও এই জুলাই-জুন অর্থবছর টিকে থাকার অন্যতম একটি প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণ, অনুদান এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে পরিচালনা করা এর ফলে তুলনামূলক অনেক সহজ হয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব অর্থবছর জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়ার কারণে তাদের দেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সময়সূচির সাথে মিল রেখে বাংলাদেশ এই জুলাই-জুন পদ্ধতি অনুসরণ করায় নানা ধরনের বাড়তি সুবিধা পায়। একসময় পাকিস্তান সরকার এপ্রিল মাসকে অর্থবছরের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করলেও পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও আর্থিক সহায়তার জটিল প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্য আনতে তারাও জুলাই মাসকে অর্থবছরের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
অবশ্য দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষক এই প্রচলিত অর্থবছরের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতে বাংলাদেশে জুন মাসে পুরোদমে বর্ষাকাল শুরু হওয়ার কারণে দেশের অনেক নিচু অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায় এবং মাঝেমধ্যে দেশজুড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ঠিক এমন একটি দুর্যোগপূর্ণ সময়ে একটি বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মুহূর্তের বরাদ্দ খরচ করা এবং নতুন আরেকটি অর্থবছরের অর্থ বরাদ্দ ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে চরম প্রশাসনিক অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়। এই জটিলতা এড়াতে অনেক বিশেষজ্ঞই বাংলাদেশের অর্থবছর পরিবর্তন করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের আদলে এপ্রিল থেকে শুরু করার জন্য সরকারের কাছে একাধিকবার জোরালো মতামত দিয়েছিলেন।
তবে আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমে গ্রামীণ রাস্তাঘাট বা বড় অবকাঠামো ও নির্মাণসংক্রান্ত কার্যক্রম কিছুটা ঋতুনির্ভর হলেও দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক কার্যক্রম সরাসরি এই ঋতু পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়া বা বার্ষিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, তার মূল কারণ ঋতু পরিবর্তন নয়; বরং সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না হওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই এর জন্য দায়ী।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের বর্তমান প্রশাসনিক ও কাঠামোগত মূল কাঠামোতে প্রয়োজনীয় কোনো সংস্কার না এনে কেবল খাতা-কলমে অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তন করলে কোনো কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। কার্যকর ফলাফল পেতে হলে প্রথমে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।