আয়-ব্যয়ের হিসাব ছাড়াও আরও যা থাকে বাজেটে

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১১:২৮ এএম

প্রতি বছর জুন মাস এলেই জাতীয় বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে শুরু হয় নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ ও জল্পনা-কল্পনা। দীর্ঘ সময় পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন হচ্ছে আজ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্বের ঘাটতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো কঠিন সময়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই ঐতিহাসিক বড় বাজেটটি নিয়ে চারদিকে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- বাজেট আসলে কী? এটি কি কেবলই কিছু সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরও গভীর কোনো অর্থনৈতিক সমীকরণ?

বাজেট একটি দেশের আগামী এক বছরের সম্ভাব্য যাবতীয় আয় ও ব্যয়ের একটি সুবিন্যস্ত ও বিস্তারিত সরকারি পরিকল্পনা। একটি নির্দিষ্ট অর্থবছর (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র কোন কোন উৎস থেকে কত টাকা রাজস্ব পাবে এবং তা কোন কোন খাতে কীভাবে খরচ করবে, তার একটি আইনি পূর্বাভাসই হলো বাজেট। 

বাংলাদেশের সংবিধানে অবশ্য সরাসরি 'বাজেট' শব্দটি ব্যবহার না করে একে বলা হয়েছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’। এটি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এর মাধ্যমে সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি এবং জনকল্যাণের পরিকল্পনা ফুটে ওঠে।

বাজেট মানেই শুধু ব্যয়ের তালিকা নয়। বাজেটে যেমন সম্ভাব্য ব্যয়ের লক্ষ্য থাকে, ঠিক তেমনি সেই ব্যয় মেটানোর জন্য আয়ের উৎসগুলোর বিবরণও থাকে। যেমন- এবারের বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু খরচের তুলনায় আয় কম হওয়ায় বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার একটি বড় 'ঘাটতি'ও রয়েছে। এই ঘাটতি কীভাবে দেশি-বিদেশি ঋণ বা অনুদানের মাধ্যমে পূরণ করা হবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পথরেখাও বাজেটের ভেতরেই উল্লেখ থাকে। 

এছাড়া আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার একটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাও বাজেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সরকারের আয়-ব্যয়ের ধরণ এবং সমতার ওপর ভিত্তি করে বাজেটকে কয়েকটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়:

চলতি বাজেট: এটি হলো সরকারের দৈনন্দিন ও প্রশাসনিক কাজ চালানোর বাজেট। কর (ভ্যাট, আয়কর, ভূমি কর) এবং অ-কর রাজস্ব (সরকারি প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ, ঋণের সুদ) থেকে এই আয় আসে। আর তা ব্যয় হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দেশরক্ষার মতো নিয়মিত খাতগুলোতে, যা প্রতি বছরই অপরিবর্তিত থাকে। এই বাজেটে সাধারণত আয় বেশি থাকে, অর্থাৎ উদ্বৃত্ত দেখা যায়।

মূলধনী বা উন্নয়ন বাজেট: চলতি বাজেটের উদ্বৃত্ত অর্থ এবং দেশি-বিদেশি ঋণ ও অনুদান নিয়ে গঠিত হয় এই মূলধনী বাজেট। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। রাস্তাঘাট, বড় সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের মতো বড় বড় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এই বাজেটের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হয়।

অন্যদিকে আয় ও ব্যয়ের পরিমাণের সমতার ওপর ভিত্তি করে বাজেট আবার দুই প্রকার:

সুষম বাজেট: যখন সরকারের সম্ভাব্য আয় এবং ব্যয় একদম সমান হয়, তখন তাকে সুষম বাজেট বলে। এতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও উন্নয়নশীল দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ বা জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় এটি খুব একটা কার্যকর নয়।

অসম বাজেট: আয় ও ব্যয়ের পরিমাণ সমান না হলে তাকে অসম বাজেট বলে। এটি আবার দুই রকমের হতে পারে- উদ্বৃত্ত বাজেট (আয় যখন ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়) এবং ঘাটতি বাজেট (ব্যয় যখন আয়ের চেয়ে বেশি হয়)। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে 'ঘাটতি বাজেট' পেশ করা হয় এবং সেই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র কিংবা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হয়।

বাজেট কেবল খাতা-কলমের হিসাব নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। জাতীয় সংসদে পেশ করার পর সংসদ সদস্যদের আলোচনা, সংশোধন এবং চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পরেই এই বিশাল আর্থিক পরিকল্পনাটি পরবর্তী এক বছরের জন্য কার্যকর রূপ লাভ করে।

SN
আরও পড়ুন