গুরু দায়িত্ব আমির খসরুর কাঁধে, কেমন হচ্ছে বাজেট ভাবনা

প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের পর বিএনপির হয়ে এবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হাল ধরেছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটিই প্রথম এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমাজের বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই ঐতিহাসিক বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদে তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড আকারের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে অর্থমন্ত্রী জানান, এই বাজেটে ছাত্র, শ্রমিক, কামার, কুমারসহ সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা হবে। বিগত আমলের অনিয়ম ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে একটি জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা দেওয়াই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।

চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় এবারের বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ (১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা) বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন এই বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যয়ের তুলনায় আয় কম থাকায় সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নেওয়া হবে।

আসন্ন বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ পথে এগিয়ে নেওয়া।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারী চাকরিজীবীদের জন্য এবারের বাজেটে বড় সুখবর আসতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থাকতে পারে। এছাড়া সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং দেশব্যাপী ‘খাল খনন’ কর্মসূচির রূপরেখা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতা থেকে অর্থমন্ত্রী হওয়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বাজেটে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় বড় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকছে।

নতুন অর্থবছরে বিদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি মেগা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, দেশের যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে যুব উন্নয়ন খাতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা থাকবে।

এই বিশাল বাজেট চূড়ান্ত করার নেপথ্যে অর্থমন্ত্রীকে চরম ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শেষ মুহূর্তের কাজ সম্পন্ন করতে অর্থমন্ত্রী গত পাঁচ দিন টানা ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা কাজ করেছেন।

রাজনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিক্ষাবিদ। লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রিধারী আমির খসরু চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অনারারি কনসাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।