বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার চরম অস্থিরতা এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার পটভূমিতে সূচনা হয়েছে নতুন অর্থবছর। বিদায়ী অর্থবছরে বিশাল ঘাটতির মুখ দেখলেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর কাস্টমস হাউসের জন্য দুই হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
কাস্টমস হাউস তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুর প্রথম মাস জুলাইয়ে এই বন্দরের আমদানি বাণিজ্য থেকে প্রায় ৮৯ কোটি টাকার রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে। যা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করছে।
তবে বিগত অর্থবছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনও শঙ্কার কারণ হয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। বিদায়ী অর্থবছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার বিরূপ প্রভাব, তীব্র ডলার-সংকট এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানা-পোড়েনের কারণে ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিতে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জাতীয় রাজস্ব নীতিতে বছর শেষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সীমান্ত ও বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, ঘাটতির পেছনে শুধু বৈশ্বিক বা সামগ্রিক অর্থনীতিই এককভাবে দায়ী নয়; বরং বন্দরের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনাও বড় ভূমিকা রাখছে। ভোমরা বন্দরে সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি থাকায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনাকারী দেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তারা এই বন্দর ছেড়ে সুবিধা অনুযায়ী অন্যান্য স্থলবন্দরের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির স্বাভাবিক গতি কমে গিয়ে সামগ্রিক রাজস্ব খাতে নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বন্দর সংলগ্ন বাণিজ্যিক পরিবেশ ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু বলেন, ভোমরা বন্দরকে পূর্ণ গতিশীল করতে হলে প্রথমেই এখানকার প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা জরুরি। দেশের অন্যান্য সফল স্থলবন্দরের সঙ্গে ভোমরার বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন, সেই আস্থা ফেরানো না গেলে কাস্টমসের নির্ধারিত এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, বন্দরের এই অচলাবস্থা নিরসন এবং নতুন অর্থবছরে রাজস্ব অর্জনের ধারা স্বাভাবিক রাখতে ইতোমধ্যে তোড়জোড় শুরু করেছে কাস্টমস প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন ও আমদানি-রপ্তানিকারক নেতারা ভোমরা কাস্টমস হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
উক্ত সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা তাদের দীর্ঘদিনের জমা ক্ষোভ, পোর্ট শেডের ধারণক্ষমতার অভাব, খালাস সংক্রান্ত জটিলতা ও বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে বিশদভাবে তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীদের সব দাবির বিষয়টি ধৈর্য সহকারে শোনেন ভোমরা কাস্টমস হাউসের কমিশনার মুশফিকুর রহমান।
তিনি উপস্থিত ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে জানান যে, বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে মসৃণ করতে এবং বিদ্যমান সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে কাস্টমস প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ব্যবসায়ী ও কাস্টমসের যৌথ সহযোগিতায় চলমান সংকট দূর হলে নতুন অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।