জ্বালানি খাতে খুলছে বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন দুয়ার

দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আমদানি, বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সংকটকালীন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।

রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট : সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। জ্বালানি খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) সেমিনারটির আয়োজন করে।

মন্ত্রী বলেন, সরকার বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে চায়। প্রতিবেশী ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিও জ্বালানি তেল বিপণন করছে। বাংলাদেশেও পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য তেল ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা হবে।

তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। মানুষকে আশ্বস্ত করার পরও অনেক পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে তেলের কালোবাজারি এবং অনলাইনে তেল বিক্রির ঘটনাও সামনে আসে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি তেল ব্যবসায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট আইন বা নীতিমালা করা হবে, যা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; বরং সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে। বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রেও এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হবে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সবাই ব্যবসার সুযোগ পায়।

জ্বালানি খাত নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে, তবে তা যেন দেশের স্বার্থের পরিপন্থী না হয় এবং সংকটকে আরও জটিল করে না তোলে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত সুবিধা, পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্লাস্টারভিত্তিক ও অপেক্স মডেলে রুফটপ সোলার স্থাপনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি বিনিয়োগের পরিবর্তে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবে। 

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

ভোলার গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জ্বালানিমন্ত্রী।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে পেট্রোনাসের সঙ্গে অনলাইন বৈঠক এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়া সফর করে দেশে ফিরেছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পেট্রোনাসের সহযোগিতায় ভোলার গ্যাস নিয়ে কার্যকর কিছু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।

শিল্প খাতে গ্যাস সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও নগদ অর্থপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। সরকারের কারণে কোনো ব্যবসায়ীর নাম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তালিকায় উঠুক— এটি তিনি চান না।

এলএনজি সরবরাহে সাম্প্রতিক সমস্যার কারণে সারা দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শিল্পকারখানার ওপর এর প্রভাব যাতে কম পড়ে, সরকার সে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বর্তমান শিল্প সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, শিল্পোদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিডিং রাউন্ড শুরু হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে অফশোর অনুসন্ধানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। 

শিল্পে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান মন্ত্রী। তার ভাষ্য, প্রস্তাবটি কার্যকর এবং শিল্পের জন্য উপকারী হলে অনুমোদনের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করা হবে না। সরকারের কাছে শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই অগ্রাধিকার।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা যাচ্ছে না।  

তিনি বলেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্ষমতা অনুযায়ী চালানো সম্ভব হলে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই এড়ানো যেত। দেশে উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে।

এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থ থাকলেই দ্রুত এলএনজি আমদানি বাড়ানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দরকার। একটি নতুন এফএসআরইউ চালু করতে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তবে সরকার দুই বছরের কম সময়ে এটি কার্যকর করার চেষ্টা করছে।

তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ নিয়েও কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং টার্মিনালের জন্য জমিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এলপিজি খাতে সরকারের অংশগ্রহণের পরিকল্পনার কথাও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, সরকার বাল্ক এলপিজি আমদানি করে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল ব্যবহার করে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে চায়।  

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ রুফটপ সোলার এবং অবশিষ্ট অংশ ল্যান্ডবেজড প্রকল্প থেকে আসতে পারে।

তিনি আরও জানান, অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে, যা নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে অনশোর বিডিং রাউন্ড নিয়েও কাজ চলছে।

সেমিনারে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং একতরফা সিদ্ধান্ত বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রেখে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং সব ধরনের জ্বালানি উৎসকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক গড় ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে এফএসআরইউ ও এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কারণ দেশের জ্বালানি সংকটের সঙ্গে ডলার সংকটও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্যানেল আলোচনায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো একক সমাধান নেই। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা প্রয়োজন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে মৌলিক ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে, তা না হলে বর্তমান সরকারকেও ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংকট মোকাবেলায় সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।