মেট্রো-৫ প্রকল্পের ব্যয় কমলো ২,২১৭ কোটি টাকা 

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাংশ প্রকল্পে আবারও ব্যয় কমানো হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় আরও ২ হাজার ২১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমানো হয়েছে। এর ফলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই মেট্রোরেলপথ নির্মাণে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ঋণের সুদ সংক্রান্ত ব্যয় বাদ দেওয়া। এর পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন, প্রশাসনিক ব্যয় কমানোসহ আরও কয়েকটি খাতে ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে।

নতুন এই ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত এসেছে ১৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের এক পর্যালোচনা সভার পর। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানি লিমিটেড গতকাল সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, সর্বশেষ ব্যয় কমানোর বড় অংশ এসেছে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং ঋণের সুদের হিসাব পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে। ঋণের নির্ধারিত অবকাশকাল শেষ হওয়ার পর যে সুদ পরিশোধ করতে হবে, সেটিকে বর্তমানে প্রকল্পের মূল ব্যয়ের বাইরে রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমেছে। বাকি অর্থ বিভিন্ন খাতের ব্যয়ে ছোট ছোট সমন্বয়ের মাধ্যমে কমানো হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানিয়েছেন, ব্যয় কমানোর কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন পেলেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, নথিপত্র এবং জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনাও ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।

মূল প্রস্তাব থেকে ব্যয় কমেছে ৯,১১৫ কোটি টাকা
মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাংশ প্রকল্পটির ব্যয় কমানোর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। আগের সরকারের সময়ে ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।

পরবর্তীতে সরকারের পরিবর্তনের পর প্রকল্পটির ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

অর্থাৎ মূল প্রস্তাবের তুলনায় এখন প্রকল্পটির মোট ব্যয় কমেছে ৯ হাজার ১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার আলোচনায় আসে। পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে প্রস্তাবিত ব্যয় আরও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রকল্প পরিচালক আবদুল ওয়াহাবের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে আগ্রহী। দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর মেট্রোরেল-৫ প্রকল্পটি এখন আবার সক্রিয় হয়েছে এবং দ্রুত কাজ শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সুদের ব্যয়েই কমল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা
প্রকল্পের বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশন এমন কিছু ব্যয় চিহ্নিত করেছে, যেগুলো কমানো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ঋণের প্রতিশ্রুতি-সংক্রান্ত সংরক্ষিত ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ। এই দুটি খাত থেকেই প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত এসব অর্থ প্রকল্পের মূল বাজেটে রাখার প্রয়োজন নেই। ঋণের সুদ পরিশোধের প্রয়োজন হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তা পরিশোধ করা হবে।

এ ছাড়া প্রকল্পের জন্য জমির প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে হিসাব করা হয়েছে। আগে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে বলে ধরা হয়েছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কমিয়ে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর করা হয়েছে। শুধু জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ কমানোর কারণেই প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

যানবাহন কেনা, পরামর্শক নিয়োগ, সম্মানী এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও আগের তুলনায় কমানো হয়েছে।

ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়া
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটির অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রাথমিকভাবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে। আগের প্রস্তাবে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৩৩২ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

অন্যদিকে প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণও কমানো হয়েছে। আগে যেখানে সরকারের অংশ ছিল ১৫ হাজার ৩৮৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা, সংশোধিত প্রস্তাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এই মেট্রোরেলপথের মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে এবং ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ।

গাবতলী থেকে শুরু হয়ে এই পথ টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর কেন্দ্র, আফতাবনগর পূর্ব এবং নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে পৌঁছাবে।

ঢাকার পূর্ব-পশ্চিম যাতায়াতে নতুন সম্ভাবনা
মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণাংশ শুধু একটি নতুন রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নয়; ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে গণপরিবহন সংযোগ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দেখা গেছে, মেট্রোরেল চালু হলে সড়কভিত্তিক পরিবহন ব্যবহারকারীদের একটি অংশ এই ব্যবস্থায় চলে আসতে পারে। প্রাথমিক জরিপের তথ্য ও যাতায়াতের ধরন বিশ্লেষণ করে করা হিসাব অনুযায়ী, মেট্রোরেলের যাত্রীদের ২০ দশমিক ৮ শতাংশ সড়কভিত্তিক পরিবহন থেকে স্থানান্তরিত হতে পারেন।

এর মধ্যে মাঝারি আকারের বাস থেকে যাত্রী স্থানান্তরের সম্ভাবনা ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহন থেকে মেট্রোরেলে যাত্রী স্থানান্তরের হার ০ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৭১ শতাংশের মধ্যে হতে পারে।

সমীক্ষায় আরও অনুমান করা হয়েছে, ২০৩১ সালের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার মানুষ এই মেট্রোরেলপথ ব্যবহার করতে পারেন।

এমন যাত্রীচাপ তৈরি হলে ঢাকার ক্রমবর্ধমান পূর্ব-পশ্চিমমুখী যাতায়াতের চাহিদা পূরণে মেট্রোরেল-৫ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সড়কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

পুরোনো পরিকল্পনা থেকে বর্তমান মেট্রো-৫
ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় মেট্রোরেল-৫ প্রথমে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পূর্ব-পশ্চিম মেট্রোরেলপথ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পুরো পথটিকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুটি অংশে ভাগ করা হয়।

উত্তরাংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেওয়া হয় জাপানের অর্থায়নে। আর দক্ষিণাংশের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নকে ভিত্তি করা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে অনুমোদন ও ব্যয় নিয়ে নানা পর্যালোচনার কারণে প্রকল্পটির অগ্রগতি ধীর ছিল। সর্বশেষ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ সেই জটিলতা কিছুটা কাটিয়ে প্রকল্পটিকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে ব্যয় কমানোই শেষ কথা নয়। ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়, অর্থ ও কাজের মান—তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঋণের সুদকে মূল প্রকল্প ব্যয় থেকে আলাদা করার ফলে ভবিষ্যতে সরকারের প্রকৃত আর্থিক দায় কত দাঁড়ায়, সেটিও স্বচ্ছভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।

কারণ একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্মাণ শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। কত খরচে নির্মাণ হলো, কত দ্রুত মানুষের কাজে এলো, প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী পেল কি না এবং নগরবাসীর সময় ও যাতায়াত ব্যয় কতটা কমাতে পারল—এসব বিষয় দিয়েই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির সাফল্য বিচার হবে।

মেট্রোরেল-৫ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হবে আগামী দিনে। ব্যয় কমিয়ে প্রকল্পটিকে আরও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে আনার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।

AHA
আরও পড়ুন