স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রিতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ

কুমিল্লায় তরুণ নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির ওপর উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ব্যবসা পরিচালনা, সম্ভাব্য বাজার ও গ্রাহক চিহ্নিতকরণ এবং পণ্য বিক্রির কৌশলসহ ব্যবসার বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের ধারণা দেওয়া হয়।

‘ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন ফর দ্য আরবান পপুলেশনস’ (ডাব্লিউএসইউপি) বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং দ্য কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, WASH অর্থাৎ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতের সঙ্গে তরুণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রাপ্যতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রশিক্ষণে ব্যবসার সম্ভাব্য ক্ষেত্র খুঁজে বের করা, লক্ষ্যভুক্ত গ্রাহক নির্বাচন, পণ্যের দাম নির্ধারণ, লাভ-ক্ষতির হিসাব রাখা, বিপণন ও বিক্রয় পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এর পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ এলাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের সম্ভাব্য বাজার ও ক্রেতা চিহ্নিত করার বিষয়ে ব্যবহারিক ধারণা দেওয়া হয়।

প্রশিক্ষণের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা নিজ নিজ এলাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির উদ্যোগ শুরু করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনাবা নাজিয়া হোসেন। তিনি বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় এ উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তিনি ডাব্লিউএসইউপির এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

অনুষ্ঠানে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ওয়াটার সুপার মোহাম্মদ ইউসুফও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, WASH কার্যক্রম কেবল নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় পর্যায়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য করার কাজে তরুণ নারীদের যুক্ত করা কার্যকর উদ্যোগ। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা. পারভীন আক্তার, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সাইফুদ্দিন আহমেদ এবং অপরাজিতা ট্রেড সেন্টারের স্বত্বাধিকারী ও নারী উদ্যোক্তা শেলিনা নাজনীন শেলী।

সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে যুক্ত করার ফলে অংশগ্রহণকারীরা ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ব্যবহারিক ধারণা পান। পাশাপাশি শেলিনা নাজনীন শেলী স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও বাজারজাতকরণে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

মোছা. পারভীন আক্তার বলেন, নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে প্রস্তুত করতে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়; তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সহায়তাও নিশ্চিত করা দরকার। স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যকে কেন্দ্র করে নারীরা ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করে ধীরে ধীরে তা বড় করতে পারেন।

মো. সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তরুণদের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা যুব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ নারীরা ব্যবসার মৌলিক বিষয়গুলো জানার পাশাপাশি বাজার ও গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে আগ্রহী নারীরা সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শেলিনা নাজনীন শেলী বলেন, উদ্যোক্তা হিসেবে তার অভিজ্ঞতায় ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ও সঠিক পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় মানুষের চাহিদা বুঝে মানসম্মত পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারলে তরুণ নারীদের জন্য এটি ভালো একটি আয়বর্ধক উদ্যোগ হতে পারে।

আয়োজকেরা জানান, স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রির বিষয়টিকে তারা শুধু ব্যবসার দৃষ্টিতে দেখছেন না; এর সঙ্গে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করে সামাজিক উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। স্থানীয় নারীদের এ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে তাদের জন্য আয়ের পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীও মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

ডাব্লিউএসইউপি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, WASH খাতে তরুণদের অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করার এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি মাসিক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।