দাম বাড়ার দৌড়ে বেতন কতটা পিছিয়ে?

মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসার পর হিসাবটা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে চাল-ডাল, তেল-সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন নানা খরচ। কিন্তু এসব ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না অধিকাংশ চাকরিজীবীর আয়। ফলে মাস শেষে বেতন শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে হিসাবের সব হিসাব।

একজন চাকরিজীবীর জীবনে সবচেয়ে বড় নিয়মিত ব্যয়ের একটি বাসাভাড়া। বাড়ির মালিকের খরচ বেড়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়েছে এসব কারণ দেখিয়ে বছর বছর ভাড়া বাড়ে। গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ে জ্বালানির দাম বাড়লে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয়ের কারণে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার খরচও সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে। অর্থাৎ জীবনের প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যয় সমন্বয় হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে একজন চাকরিজীবীর বেতন কতটা সমন্বয় হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ধরা যাক, একজন কর্মীর মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। কয়েক বছর আগে এই আয় দিয়ে যে জীবনযাপন করা সম্ভব ছিল, একই জীবনযাপনের জন্য এখন হয়তো তার আরও কয়েক হাজার টাকা প্রয়োজন। যদি এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে আগের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে ৩০ হাজার টাকার বেতনকে প্রায় ৩৩ হাজার টাকায় নিতে হবে। কিন্তু বেতন যদি বাড়ে মাত্র ৩ বা ৪ শতাংশ, তাহলে কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে সেই কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

অর্থনীতির ভাষায়, এটিই প্রকৃত আয় বা প্রকৃত বেতনের বিষয়। একজন কর্মী মাসে কত টাকা পাচ্ছেন, শুধু সেটি দিয়ে তার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন বোঝা যায় না। সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কত পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মূল্যস্ফীতির সময়ে বেতন সামান্য বাড়লেও যদি পণ্যের দাম তার চেয়ে বেশি বাড়ে, তাহলে কর্মীর প্রকৃত আয় কমে যায়।

তাহলে বেতন বাড়াতে অনীহা কেন?

প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতে বেতন একটি বড় পরিচালন ব্যয়। একজন কর্মীর বেতন বাড়ানোর সঙ্গে শুধু মাসিক বেতনই বাড়ে না; অনেক ক্ষেত্রে বাড়ে বিভিন্ন ভাতা, ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামো এবং অন্যান্য কর্মী সুবিধার ব্যয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বেতন বৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় হিসেবে দেখে।

আবার সরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর সঙ্গে রাষ্ট্রের বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাড়লে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বাড়ে। তাই বেতন কাঠামো পরিবর্তনের আগে রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।

কিন্তু কর্মীর বাস্তবতা ভিন্ন। তার কাছে বেতন কোনো ‘ব্যয়’ নয়; বরং পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর প্রধান উৎস।

দাম বাড়লে সমন্বয় হয়, বেতনে কেন নয়?

এখানেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। কোনো পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়লে ব্যবসায়ী তার দাম সমন্বয় করতে পারেন। বাড়ির মালিক খরচ বাড়ার কথা বলে ভাড়া বাড়াতে পারেন। পরিবহন খরচ বাড়লে ভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে। কিন্তু একজন চাকরিজীবী নিজের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এই যুক্তিতে প্রতি বছর নিজের বেতন একই অনুপাতে বাড়াতে পারেন না।

অনেক চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মূল্যায়ন, পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা কিংবা নতুন বেতন কাঠামোর ওপর। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি যত দ্রুত বদলায়, ব্যক্তিগত আয় তত দ্রুত বদলায় না।

এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা বেশি চাপে পড়েন। কারণ আয়ের বড় অংশই তাদের খাবার, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের মতো মৌলিক ব্যয়ে চলে যায়। এসব খাতে দাম বাড়লে খরচ কমানোর সুযোগও সীমিত থাকে।

বেতন বাড়লে কি আবার দাম বাড়বে?

বেতন বাড়ানোর বিরোধিতায় প্রায়ই একটি যুক্তি সামনে আসে বেতন বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, আর সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে চলে যেতে পারে। অর্থনীতিতে এ ধরনের পরিস্থিতিকে মজুরি–মূল্য সর্পিল হিসেবে আলোচনা করা হয়।

তবে বেতন বাড়লেই যে একই হারে বাজারদর বাড়বে, এমন সরল সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে নেই। একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়লে কর্মীর বেতন বাড়িয়েও প্রতিষ্ঠান সেই ব্যয় সামলাতে পারে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটি অংশ কর্মীদের বেতন সমন্বয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদনশীলতা, কাঁচামালের দাম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পুরো দায় শুধু কর্মীর বেতন না বাড়ানোর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

বেতন কি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত?

অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয় সমন্বয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কিছু দেশে নির্দিষ্ট সময় পরপর বেতন পর্যালোচনা করা হয়। কোথাও আবার মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে বেতন সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিয়মিত মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বেতন কাঠামো পর্যালোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সেটি এমনভাবে করতে হবে, যাতে একদিকে কর্মীর ক্রয়ক্ষমতা অযথা কমে না যায়, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের ওপরও অসহনীয় চাপ তৈরি না হয়।

কারণ একজন কর্মীর বেতন শুধু তার ব্যক্তিগত আয় নয়। সেটি তার পরিবারের ভোগব্যয়, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বেতন দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে সঞ্চয় কমায়, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় খরচও কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়।

দিনশেষে প্রশ্নটা জীবনযাত্রার

দাম বাড়ার বিষয়টি আমরা প্রায়ই আলাদা আলাদা করে দেখি আজ বাজারে সবজির দাম বেড়েছে, কাল বাসাভাড়া বেড়েছে, পরদিন পরিবহন খরচ বেড়েছে। কিন্তু একজন চাকরিজীবীর জন্য এগুলো আলাদা কোনো ঘটনা নয়। সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়ে তার মাসিক বাজেটে।

তাই প্রশ্ন শুধু ‘বেতন বাড়বে কি না’ এটি নয়। প্রশ্ন হলো, একজন কর্মী যে আয় করছেন, সেই আয় দিয়ে তিনি আগের মতো জীবনযাপন করতে পারছেন কি না।

পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি বাজার নিজের নিয়মে সমন্বয় করতে পারে, বাড়িভাড়া যদি সময়ের সঙ্গে বাড়তে পারে, তাহলে কর্মীর আয়ও কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায় সেই আলোচনা এখন আরও জরুরি।

কারণ বেতন কেবল একটি সংখ্যার নাম নয়। একটি পরিবারের মাসের খাবার, সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, বাসস্থানের নিরাপত্তা এবং কিছুটা স্বস্তির সঙ্গে সেই সংখ্যাটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।