জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ধাক্কা এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। পাম্পে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীর বাজারে বেড়েছে সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি, আটা-ময়দা, দুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম। একই সঙ্গে বাড়ছে পণ্য পরিবহনের খরচ। ফলে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।

২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দরে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে। এর আগে ডিজেল ছিল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা ও অকটেন ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানির দামই এক ধাক্কায় লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর প্রাথমিক প্রভাব পড়বে পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনে; এরপর তা ছড়িয়ে পড়বে খাদ্য, সেবা ও অন্যান্য পণ্যের দামে। বাংলাদেশ ব্যাংকও জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

কারওয়ান বাজার, নিউ মার্কেট, হাতিরপুলসহ বিভিন্ন বাজারে শিম ১৭০ থেকে ২০০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলা ও পটোলের দামও বেড়েছে। কিছু সবজির দাম এক সপ্তাহেই কেজিতে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

কাঁচামরিচের দামও বেড়েছে। বিভিন্ন বাজারে পণ্যের দামে ওঠানামা থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উৎপাদন এলাকা থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া বেড়েছে। সেই বাড়তি খরচ পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা পর্যায়ে চলে আসছে।

একজন ব্যবসায়ী জানান, যশোর থেকে কারওয়ান বাজারে মাঝারি ট্রাকের ভাড়া আগে প্রায় ১৮ হাজার টাকা ছিল। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর তা বেড়ে প্রায় ২১ হাজার টাকা হয়েছে। ফলে উৎপাদন এলাকা থেকে ঢাকায় সবজি আনার খরচও বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে পণ্য পরিবহনে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ বড় পাইকারি বাজারগুলোতে বিভিন্ন রুটে ট্রাক ভাড়া ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ২৬৫ বস্তা চাল পরিবহনের খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।

শুধু কৃষিপণ্য নয়, তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্পপণ্য পরিবহনেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব উৎপাদন থেকে সরবরাহ—পুরো চেইনেই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোও জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব সামাল দিতে ছয় ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার পর বাসভাড়াও বেড়েছে। প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সময়ে লঞ্চ ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়াও বাড়ছে।

এতে শুধু যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয়ই বাড়ছে না, বরং পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ছে। আর পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ সাধারণত পণ্যের বিক্রয়মূল্যে যুক্ত হয়।

এ কারণেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাবের চেয়ে এর পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর মাছ ও মুরগির দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকার বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাছের পাইকারি দাম কেজিতে প্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজার পরিদর্শনে উঠে এসেছে। ডিমের দামও বেড়ে ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে উঠেছে।

মুরগির সরবরাহেও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। উৎপাদন এলাকা থেকে খামারের মুরগি বাজারে আনতে বাড়তি খরচ হওয়ায় সেই ব্যয়ও খুচরা দামে যুক্ত হচ্ছে।

তবে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়েনি। কিছু বাজারে চাল, ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিমের দাম আগের সপ্তাহের কাছাকাছি রয়েছে বলেও বাজার পরিদর্শনে পাওয়া গেছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আটা ও ময়দার বাজারেও বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে। প্যাকেটজাত ও তরল দুধের দামও কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বাজারে বিভিন্ন ধরনের আটা, ময়দা ও চালের দাম নতুন করে বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। দুধের ক্ষেত্রে কয়েকটি বেসরকারি ব্র্যান্ড প্রতি লিটারে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যবহৃত হয় এমন পণ্যের ওপরও ধীরে ধীরে প্রভাব পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ছিল না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে আগস্টে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এটি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।

অর্থাৎ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের দৈনন্দিন খরচের বড় অংশজুড়ে থাকা পণ্য ও সেবার দামে এখনও উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে।

এর মধ্যেই নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের বার্ষিক মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেলনির্ভর। সড়ক পরিবহন, পণ্য পরিবহন ও সেচে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ফলে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় ওঠা শুধু যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় বাড়ায়নি; কৃষি উৎপাদন, সেচ, পণ্য পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বাড়িয়েছে। BRAC EPL-এর বিশ্লেষণ বলছে, প্রথম ধাপে পরিবহন, সেচ ও বিতরণ ব্যয় বাড়বে এবং দ্বিতীয় ধাপে খাদ্য, সেবা ও মজুরি প্রত্যাশার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বেই। উৎপাদন এলাকা থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার, প্রতিটি ধাপে পরিবহন যুক্ত থাকায় বাড়তি ব্যয় কোনো না কোনোভাবে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে।

তবে ভোক্তাদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, পরিবহন ব্যয় যতটা বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তার তুলনায় পণ্যের দাম বেশি বাড়ানো হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বাজার পরিদর্শনে ক্রেতাদের এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো-জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পুরো প্রভাব এখনও বাজারে পৌঁছেনি।

কারণ নতুন জ্বালানি দরে পরিবহন করা পণ্যগুলো ধীরে ধীরে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ঢুকবে। তখন পরিবহন ব্যয়ের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, নতুন চালানগুলোতে বাড়তি পরিবহন খরচ যুক্ত হলে অনেক পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ এখন যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, সেটিই শেষ ধাপ নয়। পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত থাকলে নিত্যপণ্যের বাজারে দ্বিতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বাজারকে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের ওপর ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। পরিবহন ভাড়া কতটা বাড়া যৌক্তিক, কোন পণ্যের পরিবহন ব্যয় কত বাড়ছে এবং সেই অনুপাতে খুচরা মূল্য কতটা সমন্বয়- হচ্ছেএসব বিষয়ে দ্রুত হিসাব করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং জোরদার করা দরকার, যাতে জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কেউ অস্বাভাবিক মুনাফা করতে না পারে।

কারণ তেলের দাম পাম্পে ২০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু সেই ২০ টাকার ধাক্কা যদি পরিবহন, উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা, প্রতিটি স্তরে কয়েক দফা করে যোগ হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই।