তেলের দাম ও বন্ডের সুদ বাড়ায় এশিয়ার শেয়ারবাজারে দরপতন

জ্বালানি তেলের দাম ও বন্ডের সুদ বা ইয়েল্ড বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাবে শুক্রবার  (২ অক্টোবর) এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। একই সঙ্গে দিনের শেষ দিকে প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রতিবেদনের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। 

এ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ পরবর্তী সময়ে সুদের হার কীভাবে নির্ধারণ করতে পারে, তার ধারণা পাওয়া যাবে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগামী বছর পর্যন্ত ঋণের খরচ বা সুদের হার বাড়িয়ে যেতে বাধ্য হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বড় অর্থনীতির সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড দ্রুত বেড়ে যায়।

শুক্রবার দিনের শুরুতে বন্ডের সুদ বা  ইয়েল্ড কিছুটা কমলেও বাজারে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান ধরনের দামই কিছুটা বেড়েছে। আগের দিনের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এ দাম আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংকটের অবসান নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় বাজারে চাপ রয়েছে।

উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনা পাঠাচ্ছে। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও যুদ্ধ শুরু করতে পারেন—এমন জল্পনা তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজের বহর আগামী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে এবং বন্ডের সুদ ২০০০-এর দশকের পর দেখা যায়নি—এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

ফরেক্স ডট কমের ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, ‘বন্ডবাজার এখন জুন ২০২৭-এর মধ্যে আরও চার দফা ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা ধরে মূল্য নির্ধারণ করছে।’

তার মতে, বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় এটি বড় পরিবর্তন। তখন একই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা ছিল।

তিনি আরও বলেন, ব্লুমবার্গ কমোডিটি ইনডেক্স গত এক বছরে ৩৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের পর গত ১২ মাসের হিসাবে এটি অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে।

রাজাকজাদা সতর্ক করে বলেন, পণ্যমূল্যের এই বড় ধরনের বৃদ্ধি আবারও পণ্যমূল্যনির্ভর মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি করতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে এবং ঋণের খরচ বাড়তে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে আগের দিনের ইতিবাচক লেনদেনও এশিয়ার শেয়ারবাজারকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

হংকংয়ের বাজারে ২ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারও কমেছে। ছুটির কারণে সাংহাইয়ের শেয়ারবাজার বন্ধ ছিল।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম আবারও বাড়ায় বাজারটি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। সিডনি ও তাইপের বাজারও বেড়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস বা কৃষি খাতের বাইরে কর্মসংস্থানের তথ্যের দিকে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজর রয়েছে। গত মাসে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর পর এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা বোঝার চেষ্টা করছেন তারা।

এ সপ্তাহে ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক পূর্বাভাসের চেয়ে কম আসায় ২৮ অক্টোবর পরপর দ্বিতীয়বার সুদের হার বাড়ানোর আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। তবে কর্মসংস্থানের তথ্য শক্তিশালী হলে আবারও সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি জোরালো হতে পারে।

এ সপ্তাহে ফেডের কয়েকজন কর্মকর্তা ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দেওয়ায় সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার প্রত্যাশাও কিছুটা বেড়েছে।

ফেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফিলিপ জেফারসন বলেন, নীতিনির্ধারকদের ‘তথ্যের প্রবণতাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, তার সহকর্মীদের সঙ্গে তাকেও নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে, আর এতে আরও সময় লাগতে পারে।

আরেক কর্মকর্তা মিশেল বোম্যান বলেন, তিনি ‘এই মুহূর্তে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার জরুরি প্রয়োজন দেখছেন না।’

এর আগে নিউইয়র্ক ফেডের প্রধান জন উইলিয়ামসও বলেছিলেন, ‘তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই এবং আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের হাতে সময় আছে।’

তবে ডালাস ফেডের প্রেসিডেন্ট লরি লোগান সতর্ক করে বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি ও ঝুঁকি বিবেচনায় ফেডের দুই প্রধান লক্ষ্য—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান—সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অর্জন করতে সুদের হার আরও ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা তার বেশি বাড়ানো প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি।’

সূত্র: বাসস