বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়ের ঢালে চা বাগান আর বিশ্বরেকর্ড গড়া সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ এখনও মানচিত্রের এক ‘অচেনা’ বা ‘অন্ধকার’ জায়গা। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাত্র ৬ লাখ ৫০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন, যা প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় খুবই নগণ্য। ১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দেশটিতে ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য থাকলেও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এটি এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
ট্যুর কোম্পানি ‘নেটিভ আই ট্রাভেল’-এর পরিচালক জিম ও’ব্রায়েন বলেন, ‘মানুষের অবচেতনে এই দেশটি সম্পর্কে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বন্যার চিত্র ভাসে। আমরা সবসময় নেতিবাচক কারণেই দেশটির নাম শুনি।’
তবে স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা মনে করেন, এই ধারণাটি দেশের আসল বৈচিত্র্যকে আড়াল করে রাখে। ‘বেঙ্গল এক্সপেডিশন ট্যুরস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ফাহাদ আহমেদ বলেন, ‘পর্যটকরা এখন স্থানীয় জীবনযাত্রা দেখতে চান। ঢাকার জনাকীর্ণ রাস্তা থেকে শুরু করে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান আর কক্সবাজারের ৭৫ মাইলের দীর্ঘতম বালুকাময় সৈকত সবখানেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।’
ব্রিটিশ পর্যটক আনন্দ প্যাটেলের বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
ব্রিটিশ পর্যটক আনন্দ প্যাটেল এবং আইরিশ পর্যটক গ্যারি জয়েস ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। আনন্দ প্যাটেল জানান, যখন তিনি বাংলাদেশ যাওয়ার কথা বলেছিলেন, অনেকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন—কেন সেখানে যাচ্ছেন? অথচ বাংলাদেশে এসে বরিশালের ভাসমান বাজার দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
তার মতে, ‘এটি কোনো সাজানো পর্যটন প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ছিল একবারে খাঁটি বা অকৃত্রিম স্থানীয় বাজার।’
গ্যারি জয়েস ঢাকার ‘ওল্ড সিটি’ বা পুরান ঢাকার অলিগলি দেখে বিস্মিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক শহর যা কখনও ঘুমায় না। চারপাশ থেকে দৃশ্য আর শব্দ আপনাকে আক্রমণ করবে। যারা কেবল সৈকতে বসে থাকতে পছন্দ করেন না, তাদের জন্য বাংলাদেশ দারুণ একটি জায়গা।’
গাইড কাওসার আহমেদ মিলন জানান, অনেক ভ্লগার বা ইউটিউবার কেবল ভিউ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন। তারা ঢাকার ময়লার ভাগাড় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ার দৃশ্য (ট্রেন সার্ফিং) দেখান। অথচ তিনি চান পর্যটকরা ইকো-ট্যুরিজম, গ্রামীণ জীবন এবং সুন্দরবনের প্রকৃতি উপভোগ করুক।
অন্যদিকে, ফাহাদ আহমেদ মনে করেন, জাহাজ ভাঙা শিল্প কিংবা পোশাক কারখানার বাজারগুলোও বিদেশিদের জন্য আকর্ষণের বিষয় হতে পারে। যদিও সেখানে কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবে পর্যটন বাড়লে এই খাতগুলোতে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
পর্যটকদের মনে আশঙ্কার অন্যতম বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতা পর্যটকদের মনে কিছুটা ভীতি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা (অ্যাডভাইজরি) দিয়ে রেখেছে, যা পর্যটন বিকাশে একটি বড় বাধা।
ফাহাদ আহমেদ একটি চমৎকার পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘সতর্কতার সঙ্গে বললে, আমরা শ্রীলঙ্কার মতো লাখ লাখ পর্যটক (Mass Tourism) চাই না। আমরা চাই সেই পর্যটকদের, যারা সত্যিই আমাদের সংস্কৃতি এবং গ্রামকে ভালোবাসেন। যদি বিশাল সংখ্যক পর্যটক আসতে শুরু করে, তবে বাংলাদেশ তার ‘অকৃত্রিমতা’ বা নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলবে।’
বাংলাদেশ এখনও গণ-পর্যটনের ধাক্কায় কলুষিত হয়নি। যারা রোমাঞ্চপ্রিয় এবং অদেখা কিছু দেখতে চান, তাদের জন্য এটি এক চমৎকার গন্তব্য। সঠিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নেতিবাচক ধারণা কাটিয়ে উঠতে পারলে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ কেন্দ্র।