পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত—অজানা বনপথ, পাহাড়ি রিজলাইন, সমুদ্রতট আর ঐতিহ্যের ভাঁজে লুকানো গ্রাম। ২০২৫-২৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খুলে যাচ্ছে এমন কিছু নতুন ট্রেইল, যা শুধু হাঁটার পথ নয়—এগুলো হয়ে উঠছে আত্মঅন্বেষণের যাত্রা।
আজকের ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় এড়িয়ে খুঁজছেন নির্জনতা, প্রকৃতির গভীর স্পর্শ আর স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শতকোটি মানুষ ট্রেইলে হাঁটেছেন—হাইকিং এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণ কার্যক্রম।
কসোভোর পর্বতারোহী উতা ইব্রাহিমি—যিনি সম্প্রতি বিশ্বের ১৪টি ৮,০০০ মিটার শৃঙ্গ জয় করা বলকান অঞ্চলের প্রথম মানুষ—বলছেন, “প্রকৃতির ভেতর নির্জন হাঁটা শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক সুস্থতা এনে দেয়। একজোড়া বুট আর গন্তব্যের ইচ্ছে থাকলেই শুরু করা যায়।” গত বছর তিনি পশ্চিম বলকানকে যুক্ত করা ভিয়া দিনারিকা ট্রেইলের কসোভো অংশের নবায়ন সংস্করণ চালুতেও ভূমিকা রাখেন।
হাইকিংয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে ডিজিটাল নেভিগেশন অ্যাপের হাত ধরেও। AllTrails-এ আছে প্রায় পাঁচ লাখ ডিজিটালি ম্যাপ করা রুট। Trailforks-এ দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার ট্রেইল তথ্যভান্ডার। আর Komoot ব্যবহার করছেন চার কোটির বেশি মানুষ।
চলুন ঘুরে আসি এমন পাঁচটি নতুন বা নবায়িত ট্রেইল থেকে—যেগুলো আপনাকে উপহার দেবে বিস্ময়, শান্তি আর প্রকৃতির গভীর আলিঙ্গন।
১. পোহোরিয়ে–কোজ্যাক ট্রেইল, স্লোভেনিয়া
(দৈর্ঘ্য: ১৭৪ কিমি | সময়: ১৫ দিন | শুরু: মারিবোর | শেষ: কামনিকা)
উত্তর-পশ্চিমের জুলিয়ান আল্পসের ভিড় এড়িয়ে স্লোভেনিয়ার পূর্বাঞ্চলের কম চেনা সৌন্দর্য তুলে ধরতে জুনে খুলছে পোহোরিয়ে–কোজ্যাক ট্রেইল। বৃত্তাকার এই পথের প্রবেশদ্বার শহর মারিবোর।
দুটি পর্বতমালা—পোহোরিয়ে ও কোজ্যাক—ড্রাভা নদীকে ঘিরে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটার। ২০ ধাপের মাঝারি মানের এই ট্রেইল আপনাকে নিয়ে যাবে আদিম বন, জলপ্রপাত, স্কি-ঢাল আর ১,৫৪৩ মিটার উচ্চতার চর্নি ভ্রহ শৃঙ্গে। পথে পথে রয়েছে পাহাড়ি কুঁড়েঘর—ট্রেকারদের বিশ্রামের ঠিকানা।
২. রকি টু নরডেগ রেল ট্রেইল, কানাডা
(দৈর্ঘ্য: ১০৯ কিমি | সময়: ৬ দিন)
কানাডিয়ান রকিজের পাদদেশে, আলবার্টা প্রদেশে পুরোনো রেললাইনকে রূপ দেওয়া হয়েছে নতুন হাইকিং ট্রেইলে। ঐতিহাসিক টনটন ট্রেসল সেতু পেরিয়ে, ঘন বন আর হ্রদের পাশ দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।
২০২৫ সালের শরতে প্রায় ৫০ কিমি অংশ উন্মুক্ত হয়েছে। শীতেও যেন ব্যবহার করা যায়—সে ভাবনায় রাখা হয়েছে ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং, ডগস্লেডিং ও স্নোশুয়িংয়ের সুযোগ।
৩. কিং চার্লস তৃতীয় ইংল্যান্ড কোস্ট পাথ
(দৈর্ঘ্য: ২,৭০০+ মাইল | সময়: প্রায় ৫ মাস)
২০২৩ সালে কিং চার্লস তৃতীয়-এর অভিষেক উপলক্ষে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রেইল পুরো ইংল্যান্ড উপকূল ঘুরে এসেছে। সম্পূর্ণ হলে এটি হবে বিশ্বের দীর্ঘতম ব্যবস্থাপিত উপকূলীয় পথ।
উত্তর-পূর্বের দুর্গ ও খাড়া ক্লিফ থেকে শুরু করে দক্ষিণের ব্রাইটন, পোর্টসমাউথ ও সাউদাম্পটনের মতো শহর, আবার উত্তর-পশ্চিমে রোমান ধ্বংসাবশেষ—এই ট্রেইল যেন ইংল্যান্ডের জীবন্ত ইতিহাসপাঠ।
৪. ইস্ট মায়োর্কা GR-226, স্পেন
(দৈর্ঘ্য: ১০০ কিমি | সময়: ৪ দিন)
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সম্পন্ন হওয়া এই ট্রেইলটি হালকা ট্রেকিং আর সমুদ্রসৈকতে বিশ্রামের চমৎকার সমন্বয়। চার দিনে প্রায় ২৫ কিমি করে সহজ হাঁটা।
ফার্ম, আঙ্গুরক্ষেত, ১৩শ শতকের বেলপুইগ মঠ, ৩,০০০ বছরের পুরোনো ব্রোঞ্জ যুগের প্রত্নস্থল—সব মিলিয়ে ইতিহাস ও প্রকৃতির মেলবন্ধন। শেষে আপনার সামনে দ্বিধা—সাদা বালুর সৈকতে বিশ্রাম, নাকি উত্তর-পূর্ব প্রান্তের নীল সমুদ্রে ডুব?
৫. ডংসেও ট্রেইল, দক্ষিণ কোরিয়া
(দৈর্ঘ্য: ৮৪৯ কিমি | সময়: ৫৫ দিন)
স্পেনের বিখ্যাত কামিনো দে সান্তিয়াগো-র অনুপ্রেরণায় নির্মিত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম উপকূল-থেকে-উপকূল ট্রেইল। ২০২৭ সালে পুরোপুরি চালু হবে, তবে ইতিমধ্যে ৭০% পথ প্রস্তুত।
পশ্চিমের আনমিয়েওন্দো দ্বীপ থেকে শুরু করে পূর্ব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথ আপনাকে নিয়ে যাবে বায়েকদু-দেগান পর্বতমালা, ইউনেস্কো ঐতিহ্যস্থান, ধানক্ষেত, হাজার বছরের বৌদ্ধ মন্দির আর শত শত গ্রামে।