ইরানের সাথে সুসম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় রাখা বিশ্বের গুটিকয় বড় অর্থনীতির মধ্যে চীন অন্যতম। অনেকে মনে করেন, বেইজিং ইরানি তেল ক্রয়ের মাধ্যমেই দেশটির সরকারকে টিকিয়ে রেখেছিল। তাই চীন একটি দ্ব্যর্থহীন বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা এবং এর ভূখণ্ডকে সম্মান করা উচিত। বেইজিং এই হামলার তাৎক্ষণিক অবসান দাবি করেছে যাতে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। পাশাপাশি অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, চীন যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তা হলো- পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করবে, যার ওপর বেইজিং ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চীনের উদ্বেগের আরও একটি কারণ আছে। বেইজিং বছরের পর বছর ধরে একটি 'বহু-মেরু' বিশ্ব গড়ার কাজ করছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কম থাকবে। তারা তেহরান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখে। এখন বেইজিং ভয় পাচ্ছে যে, ইরানে যদি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change) ঘটে, তবে তা বৈশ্বিক মিত্রতা বা জোটগুলোকে ওয়াশিংটনের অনুকূলে পুনর্গঠিত করবে, বেইজিংয়ের অনুকূলে নয়।
২০২৬ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বেইজিংয়ের এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য।
অর্থনৈতিক প্রভাব
চীন ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। বেইজিং আশঙ্কা করছে, ইরানে চলমান এই হামলা যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এতে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে, যা চীনের উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য চরম হুমকির কারণ হতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন বা পরিবর্তন ঘটলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও নিরঙ্কুশ হবে। চীন মনে করে, ইরানে ওয়াশিংটন-পন্থি কোনো সরকার এলে তা বেইজিংয়ের ‘বহু-মেরু বিশ্ব’ গড়ার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হেলে পড়বে।
চীনের দাবি
চীন স্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে এবং অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে কূটনীতির পথে ফেরার তাগিদ দিয়েছে। বেইজিংয়ের কাছে ইরানের স্থিতিশীলতা মানেই হলো তাদের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা।