বিপদে কেন তেহরানের পাশে নেই রাশিয়া-চীন? 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ সহস্রাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর তেহরানের দুই পরম মিত্র রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। কূটনৈতিকভাবে কঠোর নিন্দা জানালেও সামরিক ময়দানে রহস্যময় নীরবতা পালন করছে মস্কো ও বেইজিং। কেন তারা এখন পর্যন্ত ইরানকে কোনো সরাসরি সহায়তা দিলো না-তা নিয়ে আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

হামলার পরপরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনি হত্যাকে ‘মানবিক ও নৈতিক নিয়মের নির্মম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলকে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি দুই দেশ মিলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকও ডেকেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তেহরানের আকাশে যখন মার্কিন যুদ্ধবিমান গর্জে উঠছে, তখন মস্কো বা বেইজিংয়ের কোনো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সেখানে দৃশ্যমান নয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া-ইরান এবং ২০২১ সালে চীন-ইরান বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার কথা থাকলেও এসব চুক্তিতে একটি বড় ‘ফাঁক’ রয়ে গেছে- তা হলো ‘পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষা’র কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশকে যুদ্ধে নামতেই হবে, এমন কোনো ধারা চুক্তিতে নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো ফ্রন্টে সরাসরি মার্কিন বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি পুতিন নিতে চাইছেন না। তাছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের একটি অলিখিত সমঝোতা রয়েছে যে তারা একে অপরকে সরাসরি আক্রমণ করবে না।

আরেকটি নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সত্য হলো, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে তেলের দাম বাড়লে তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার কোষাগারই সমৃদ্ধ হবে। এছাড়া বৈশ্বিক মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরে যাওয়াও ক্রেমলিনের জন্য কৌশলগত সুবিধা।

ইরানের তেলের ৮৭ শতাংশই কেনে চীন। ফলে ইরান স্থিতিশীল থাকা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় ইরানের বাজার বেইজিংয়ের কাছে খুবই নগণ্য। চীন মূলত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে ফায়দা লুটতে চায়। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো ইচ্ছেই নেই শি জিনপিংয়ের।

রাশিয়া ও চীন চায় না ইরানের বর্তমান শাসনের পতন হোক, কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বেড়ে যাবে। তবে তারা নিজেরা রক্তাক্ত না হয়ে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক মঞ্চে ‘ভেটো’ ক্ষমতা আর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই তেহরানকে রক্ষার চেষ্টা করছে।