পুরুষের আধিপত্য ভেঙে বিশ্ব কাঁপাচ্ছেন ৭ দুর্ধর্ষ নারী

ইতিহাসের পাতায় ‘অভিযাত্রী’ বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে তুষারশুভ্র শৃঙ্গে পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পুরুষের ছবি। কিন্তু আধুনিক অভিযাত্রার সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছেন একদল সাহসী নারী। পর্বতারোহণ থেকে মরুভূমি পাড়ি দেওয়া, কিংবা হিমাঙ্কের নিচে বরফ-শীতল পানিতে সাঁতার—অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলছেন এই অদম্য নারীরা। আজ আমরা তুলে ধরছি এমন সাতজন নারীকে, যারা বিশ্বজয়ের নেশায় ভেঙে ফেলেছেন সব সামাজিক ও শারীরিক গণ্ডি।

১. হ্যাজেল ফিন্ডলে: খাড়া পাহাড়ের রানি


যুক্তরাজ্যের হ্যাজেল ফিন্ডলে বিশ্বের অন্যতম সেরা রক ক্লাইম্বার। তিনি প্রথম ব্রিটিশ নারী হিসেবে অত্যন্ত কঠিন ‘ই৯ ট্রেড রুট’ জয় করেছেন। কেবল পাহাড় চড়াই নয়, তিনি ‘স্ট্রং মাইন্ড’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিযাত্রীদের ভয় জয় করার প্রশিক্ষণও দেন। তাঁর মতে, ‘অভিযান কেবল বীরত্ব নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থা।’

২. অ্যালিস মরিসন: পায়ে হেঁটে সৌদি আরব জয়


অ্যালিস মরিসন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পায়ে হেঁটে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পুরো সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছেন। ১১২ দিনে তিনি ২,১৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। এর আগে তিনি সাইকেলে চড়ে কায়রো থেকে কেপটাউন পর্যন্ত ১২,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার রেকর্ডও গড়েছেন।

৩. লিজি কার: ক্যানসার জয়ী জলকন্যা


২৬ বছর বয়সে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর জীবনযুদ্ধে দমে না গিয়ে লিজি কার বেছে নেন প্যাডেলবোর্ডিং। তিনি প্রথম নারী হিসেবে প্যাডেলবোর্ডে পুরো ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন। তিনি ‘প্ল্যানেট পেট্রোল’ নামক এক সংস্থার মাধ্যমে নদী ও সাগরের প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন।

৪. ইভা জু বেক: দুর্গম পথের ভ্লগার


ইউটিউবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইভা জু বেক নিজেকে তৈরি করেছেন দুর্গম ও নির্জন এলাকায় একাকী ভ্রমণের বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন অভিযান ছিল আর্কটিক সার্কেলে ৩২০ মাইলের আল্ট্রা ম্যারাথন দৌড়ানো। তীব্র শীত ও বৈরী পরিবেশে তাঁবুতে থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন অসাধ্য বলে কিছু নেই।

৫. লুসি শেফার্ড: আমাজনের অরণ্যে


লুসি শেফার্ড একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিযাত্রী। আমাজনের গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চল—সবখানেই তাঁর অবাধ যাতায়াত। ২০২১ সালে তিনি গায়ানার দুর্গম কানুকু পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন। তাঁর উদ্দেশ্য কেবল রেকর্ড গড়া নয়, বরং বিপন্ন প্রকৃতিকে রক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

৬. বারবারা হার্নান্দেজ: বরফ কন্যা


‘আইস মারমেইড’ বা বরফ কন্যা নামে পরিচিত চিলির এই নারী কোনো বিশেষ পোশাক (ওয়েটস্যুট) ছাড়াই আন্টার্কটিকার বরফ-শীতল পানিতে দীর্ঘতম সাঁতারের গিনেস রেকর্ড গড়েছেন। সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় জনসচেতনতা গড়তেই তিনি এমন বিপজ্জনক সব অভিযান বেছে নেন।

৭. আইওনা বারবু: অদম্য দৌড়বিদ


আইওনা বারবু প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এক বছরে বিশ্বের ৬টি কঠিনতম ‘বিয়ন্ড দ্য আল্টিমেট’ রেস সম্পন্ন করেছেন। আমাজনের রেইনফরেস্ট থেকে শুরু করে কিরগিজস্তানের তিয়ান শান পর্বতমালা—সর্বত্রই তিনি তাঁর পদচিহ্ন এঁকেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিকূল পরিবেশ মানুষকে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

এই সাত নারীর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে, অভিযাত্রা মানে কেবল একটি দেশের পতাকা কোনো চূড়ায় স্থাপন করা নয়; বরং এটি নিজের ভেতরের সত্তাকে চেনা এবং প্রকৃতির সুরক্ষায় অবদান রাখার এক দীর্ঘ লড়াই।