রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়ার একটি নৌ-অ্যাকাডেমিতে আটকা পড়েছিলেন ১৬ বছর বয়সী কিশোর রোস্তিস্লাভ লাভরভ। ইউক্রেনীয় এই কিশোরকে জোর করে রুশ নাগরিক বানানোর চেষ্টা চলছিল, এমনকি তার জন্য একটি ভুয়া ‘রুশ জন্মসনদ’ও তৈরি করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু লাভরভ দমে যাননি। ২০২৩ সালের এক সকালে ইউনিফর্ম পরেই ক্লাসে যাওয়ার নাম করে অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। শুরু হয় এক বিপজ্জনক গোপন যাত্রা।
আজ ১৯ বছর বয়সী লাভরভ কিয়েভে বাস করছেন। তিনি সেই ২ হাজার ইউক্রেনীয় শিশুর একজন, যারা গত কয়েক বছরে রাশিয়া, বেলারুশ বা রুশ অধিকৃত অঞ্চল থেকে নিজ দেশে ফিরতে পেরেছেন। তবে এই ফেরার পথ মোটেও সহজ ছিল না।
ইউক্রেন সরকারের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে প্রায় ২০ হাজার শিশুকে জোরপূর্বক রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের ফিরিয়ে আনতে কাতার বা যুক্তরাষ্ট্র (মেলানিয়া ট্রাম্পের বিশেষ স্কিম)-এর মতো দেশের মাধ্যমে কিছু আনুষ্ঠানিক চেষ্টা চললেও, সফলতার হার ২৫ শতাংশেরও কম। বাকিদের ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে ‘সেভ ইউক্রেন’ (Save Ukraine) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাইকোলা কুলেবা একে একটি ‘বিশেষ সামরিক অপারেশন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, তারা রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেন না কারণ এতে শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তারা মূলত একটি ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রেলপথ’ বা গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত কিশোররা জানিয়েছেন, রুশ অধিকৃত অঞ্চলের স্কুলগুলোকে ‘মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯ বছর বয়সী তারাস (ছদ্মনাম) জানান, স্কুলগুলোতে শিশুদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র (অটোমেটিক গান) খোলা এবং পুনরায় জোড়া লাগানো শেখানো হয়। তাদের জোর করে রুশ ইউনিফর্ম পরিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যারা রুশ পাসপোর্ট নিতে অস্বীকার করে বা সন্তানদের স্কুলে পাঠায় না, তাদের ‘চিলড্রেন কলোনি’তে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
সেভ ইউক্রেনের কর্মীরা জানান, অনেক শিশুকে রাশিয়ার পরিবারগুলো দত্তক নিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়ায় থাকায় ছোট শিশুদের মনে ইউক্রেন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে ইউক্রেনে ‘নাৎসি’ শাসন চলছে।
ইউলিয়া দভোরনিচেনকো নামে এক বিধবা মায়ের গল্প আরও করুণ। ২০২১ সালে তাকে ‘ইউক্রেনীয় গুপ্তচর’ সন্দেহে গ্রেপ্তার করে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তার দুই সন্তান দানিলো ও মার্ককে এতিমখানায় পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ভুয়া স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। প্রায় দুই বছর পর বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে ইউলিয়া মুক্তি পেলেও সন্তানদের ফিরে পেতে তাকে দীর্ঘ আইনি ও গোপন লড়াই করতে হয়েছে। যখন তারা ফিরে আসে, ইউলিয়া দেখেন তার ছোট্ট মার্ক অনেক বড় হয়ে গেছে এবং বড় ছেলে দানিলোর মুখে দাড়ি—হয়তো হারিয়ে গেছে জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময়।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং শিশু অধিকার বিষয়ক কমিশনার মারিয়া লভোভা-বেলোভার বিরুদ্ধে শিশুদের নির্বাসিত করার অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। যদিও ক্রেমলিন এই অভিযোগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউক্রেনের মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এখনও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে ১.৬ মিলিয়নের বেশি ইউক্রেনীয় শিশু রয়েছে। তাদের প্রতিটি উদ্ধার অভিযানই একেকটি রোমহর্ষক গল্পের মতো। কিয়েভে ‘সেভ ইউক্রেন’-এর অফিসে ইউক্রেনীয় পতাকার স্তূপ সাজানো আছে—প্রতিটি পতাকা এক একটি শিশুর অপেক্ষায়, যারা এখনও শত্রুর দেশে বন্দি।