মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালি। পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় রূপ নিয়েছে।
নর্থ ক্যারোলাইনার ক্যাম্পবেল ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত সামুদ্রিক ইতিহাসবিদ সালভাতোর মার্কোগ্লিয়ানোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একটি সুপরিকল্পিত এবং কৌশলগত অবরোধ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ মূলত সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরির একটি প্রক্রিয়া। মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে আসা জাহাজগুলোকে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় ফিরে যেতে বাধ্য করার নীতি গ্রহণ করতে পারে। তবে ইরানের শক্তিশালী মিসাইল ব্যবস্থা এবং ড্রোন হামলার ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন রণতরিগুলো সরাসরি উপকূলে অবস্থান না করে একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) নির্দেশনা অনুযায়ী, এই অবরোধের লক্ষ্য হবে মূলত ইরান সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। মানবিক সহায়তা বহনকারী নৌযান এবং ইরান বাদে অন্যান্য দেশের বন্দর থেকে ছেড়ে আসা জাহাজগুলোকে এই অবরোধের আওতামুক্ত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে বৈশ্বিক সমালোচনার পথ সীমিত রাখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তাদের নৌ-শক্তির ব্যাপক সংহতি ঘটিয়েছে। সালভাতোর মার্কোগ্লিয়ানোর মতে, একটি কার্যকর সমুদ্র অবরোধ পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও সম্পদের প্রয়োজন, তা বর্তমানে পেন্টাগনের হাতে রয়েছে। অতিরিক্ত রণতরি, নজরদারি বিমান এবং উন্নত রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রণালির প্রতিটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াশিংটন। ইরানের সম্ভাব্য পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ মোকাবিলায় তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজিয়েছে।
মার্কিন এই পরিকল্পনার বিপরীতে ইরানও বসে নেই। ইতিহাসবিদের মতে, যখন দুটি শক্তিশালী পক্ষ একই জলসীমায় প্রতিদ্বন্দ্বী অবরোধ জারি করে, তখন সেখানে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটটি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করা। তবে ন্যাটোর মতো মিত্র দেশগুলো যখন সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে অনীহা দেখাচ্ছে, তখন এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধ কতদিন ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক ও সামরিক স্নায়ুযুদ্ধ কোনো শান্তিপূর্ণ সমঝোতার দিকে যাবে নাকি দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সূচনা করবে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।