গত ৫০ বছর ধরে ভারতের জাতীয়, রাজ্য এবং স্থানীয় প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছেন ৭৩ বছর বয়সী নবীজান মণ্ডল। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি দেখলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) প্রকাশিত ভোটার তালিকায় তার নাম নেই।
আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ এবং ৪ মে ফল প্রকাশের তোড়জোড় যখন তুঙ্গে, তখন এই খবর তাকে দিশেহারা করে দিয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ইসিআই ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে।
নবীজান একা নন; পশ্চিমবঙ্গে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন। রাজ্যের ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের মধ্যে এটি প্রায় ১২ শতাংশ। এই ৯০ লাখের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
বাকি ৩০ লাখ ভোটার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না। বৃহস্পতিবার আলজাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী-টার্গেট করেই মুসলিমদের এই ভোটাধিকার হরন করা হচ্ছে।
নবীজানের স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে এবং তাদের জীবনসঙ্গীদের নাম তালিকায় থাকলেও বাদ পড়েছেন শুধু তিনি। কারণটি হলো : দীর্ঘ বছর ধরে নবীজান ও তার পরিবার খেয়ালই করেনি যে, তার ভোটার কার্ডে ডাকনাম ‘নবীজান’ থাকলেও আধার কার্ড ও রেশন কার্ডের মতো অন্যান্য সরকারি নথিতে নাম রয়েছে ‘নবীরুল’। এছাড়াও নির্বাচনের আগে এত বিশাল সংখ্যক মামলার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এছাড়া ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত জটিল, কারণ তাদের ভোটাধিকার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও জানিয়েছে, যাদের মামলা ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে, তাদের এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে আদালত ইসিআই-কে নির্বাচনের আগে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের অনুমতি দিতে পারে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা নবীজান আল জাজিরাকে বলেন, ‘এবার আমার পরিবারের সবাই ভোট দেবে, শুধু আমি পারব না। আমি অত কিছু বুঝি না; নাম আলাদা হওয়ার কারণে যে আমার ভোট দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, সেটা জানতাম না।’
পরিকল্পিত পদক্ষেপ: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট ১০ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশের পর ভারতেই এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজ্য যেখানে বিজেপি কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি।
২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এই রাজ্য শাসন করছে, যারা টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। ৭১ বছর বয়সী মমতা মোদির অন্যতম প্রধান সমালোচক হিসাবে পরিচিত।
রাজ্যজুড়ে ভোটার বাতিলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুসলিমরাই এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং যারা নির্বাচনের ফলে প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে গণহারে নাম কাটা গেছে। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদে ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদায় ২ লাখ ৪০ হাজার নাম বাতিল হয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনার গোবিন্দপুর, গোবরা ও বালকি গ্রামে এ ধরনের ডজনখানেক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে আল জাজিরা। তারা জানান, সব নথিপত্র ঠিক থাকার পরেও অনেকের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ বসবাসের প্রমাণ, বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন, নামের বানানে ভুল বা অভিবাসনের প্রমাণ নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন।
ইসিআই-এর দাবি, ভুয়া বা মৃত ভোটার বাদ দিতে এবং বাদ পড়া প্রকৃত ভোটারদের যুক্ত করতেই এই এসআইআর প্রক্রিয়া। তবে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাপক বিতর্ক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তবে বিরোধী দল ও মুসলিম সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) যারা ভোট দেবে না-বিশেষ করে মুসলিমদের তাদের পরিকল্পিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে ইসিআই।