ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবন

আজ ১৭ এপ্রিল, ফিলিস্তিনি বন্দি দিবস। ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে বন্দি হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পুরুষ, নারী ও শিশুর দুর্দশার কথা বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়। ২০২৬ সালে দিনটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন ইসরায়েলের নতুন ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’ এবং গাজায় চলমান পরিস্থিতির কারণে বন্দিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি বন্দি দিবসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। এই দিনে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের যোদ্ধা মাহমুদ বকর হেজাজি প্রথম বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এটি ছিল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বন্দি বিনিময়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিল ১৭ এপ্রিলকে ‘ফিলিস্তিনি বন্দি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বন্দি অধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘আদামির’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগার ও অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৯,৬০০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। এদের মধ্যে ৩,৫৩২ জন রয়েছেন ‘প্রশাসনিক আটক’ হিসেবে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট বা বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখার বিধান রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ইসরায়েলি কারাগারে বর্তমানে ৩৪২ জন শিশু এবং ৮৪ জন নারী বন্দি রয়েছেন। এছাড়া ১১৯ জন ফিলিস্তিনি বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

ইসরায়েলের ‘প্রশাসনিক আটক’ নীতির আওতায় যে কাউকে চার্জশিট বা বিচার ছাড়াই ছয় মাসের জন্য বন্দি রাখা যায়, যা অনির্দিষ্টকালের জন্য নবায়নযোগ্য। এছাড়া, ইসরায়েল বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা শিশুদের সামরিক আদালতে বিচার করে। ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ বা নির্যাতনের মাধ্যমে ‘স্বীকারোক্তি’ নিয়ে এসব বন্দিদের সাজা দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ইসরায়েল একটি নতুন আইন অনুমোদন করেছে, যেখানে ইসরায়েলিদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে এই আইনটি কেবল ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, ইহুদি ইসরায়েলিদের জন্য নয়। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই আইনটিকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফিলিস্তিনি বন্দি বিষয়ক কমিশনের তথ্য মতে, ১৯৬৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে বিভিন্ন সময়ে আটক করা হয়েছে। এটি মোট ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন জীবনে অন্তত একবার কারাবরণ করেছেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে এই গণ-গ্রেপ্তার কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি দখলের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। সূত্র: আল জাজিরা