যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিভিন্ন সংকট কবলিত ইরানের জন্য এক টুকরো আশার খবর হয়ে ফিরেছে দেশটির অন্যতম বিপন্ন প্রাণী এশীয় চিতা। কয়েক বছর ধরে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা এই প্রাণীর সংখ্যা এ বছর কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির মানুষের জন্য এক বিরল আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে কেবল ইরানই এশীয় চিতার আবাসস্থল। কনজারভেশন অব দ্য এশিয়াটিক চিতা প্রজেক্ট-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক বাকের নেজামি ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, গত বছর ইরানি কর্তৃপক্ষ মাত্র ১৭টি বন্য চিতার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। তবে ২০২৬ সালে এসে সংরক্ষণবাদীরা নতুন করে ২১টি পূর্ণবয়স্ক চিতা এবং ছয়টি শাবকের দেখা পেয়েছেন।
বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগামী এই প্রাণীর মাথা আফ্রিকান চিতার তুলনায় ছোট, পা খাটো এবং ঘাড় বেশি শক্তিশালী। একসময় আরব উপদ্বীপ, কাস্পিয়ান সাগরের আশপাশের অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এদের বিচরণ থাকলেও এখন কেবল ইরানের পূর্ব মরুভূমিতেই এদের অস্তিত্ব টিকে আছে। শিকারি, দ্রুতগতির গাড়ি ও বন্য কুকুরের হাত থেকে বাঁচতে এদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে।
এশীয় চিতা ইরানের জাতীয় গর্বের প্রতীক। দেশটির জাতীয় ফুটবল দলের জার্সিতে এই বন্যপ্রাণীর ছাপ দেখা যায়। এছাড়া মিরাজ এয়ারলাইন্স তাদের বিমানের গায়ে চিতার ছবি এঁকে এই প্রজাতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছে।
ইরানের সংরক্ষণবাদী ইমান ইব্রাহিমি বলেন, ‘এশীয় চিতা ইরানের একটি বড় প্রতীক। আমার মনে হয়, এর কারণ মানুষ এর সঙ্গে এক গভীর সংযোগ অনুভব করে। আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসে এর একটি বিশেষ জায়গা রয়েছে।’
প্রাচীন পারস্যের রাজারা গাজেল শিকারের জন্য এই চিতা ব্যবহার করতেন। তবে সাম্প্রতিক দশকে চোরাকারবারিদের শিকার, বন্দিদশা ও অবহেলার কারণে এদের সংখ্যা কয়েক ডজনে নেমে এসেছে।
সম্প্রতি ইরানের রাজনৈতিক বিরোধী মতাবলম্বীদের কাছে চিতা নিরপরাধতা ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে দেশজুড়ে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের সময় ‘বায়ারেহ’ নামের একটি প্রতিবাদী গানে বন্দিদশায় জন্ম নেওয়া ‘পিরোজ’ নামের চিতা শাবকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল।
তবে সংখ্যা বাড়লেও পরিবেশবাদীরা অতিরিক্ত আশাবাদী হতে নারাজ। ইমান ইব্রাহিমি সতর্ক করে বলেছেন, প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই যে জনসংখ্যা পুনরুদ্ধার হচ্ছে তা নয়, এটি পরিবেশগত পরিস্থিতি বা পর্যবেক্ষণের প্রচেষ্টার পরিবর্তনের কারণেও হতে পারে।
এছাড়া যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এসব প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগগুলো হুমকির মুখে পড়ছে।
পার্সিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোরাদ তাহবাজ বলেন, ‘যুদ্ধের সময় বন্যপ্রাণীদের কথা এক প্রকার ভুলে যাওয়া হয় এবং তারা অবহেলিত থাকে। এমন সময়ে চোরাকারবারিরাও সুযোগ গ্রহণ করে।’
ইরানের পরিবেশবাদীরা দীর্ঘকাল ধরেই দেশটির গোয়েন্দা নজরদারির অধীনে রয়েছেন। সংরক্ষণবাদীরা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করায় তাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহের চোখ রাখা হয়।
কোনও প্রমাণ ছাড়াই নিরাপত্তারক্ষীরা দাবি করে যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলো আসলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করছে।
এই সন্দেহের জেরে ২০১৮ সালে নয় জন সংরক্ষণবাদীকে গ্রেফতার করা হয়, যার মধ্যে একজন কারাগারে মারা যান। গত সপ্তাহেও ইমান মেমারিয়ান নামের এক বন্যপ্রাণী চিকিৎসক ও সংরক্ষণবাদীকে কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করেছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আগের গ্রেফতার হওয়া বিশেষজ্ঞদের অনুপস্থিতিতে নতুন চিতার পরিবারগুলোকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব বাধা পেরিয়ে এশীয় চিতার টিকে থাকা যেন দেশটির জন্য এক শক্তি ও আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্য এশিয়াকেন্দ্রিক বিগ-ক্যাট সংরক্ষণবাদী তানিয়া রোজেনের মতে, এমন সংকটময় সময়ে চিতার টিকে থাকার লড়াই দেশটির জন্য এক শক্তিশালী ও প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা। সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস