মিসরের সামরিক বাহিনী হালে সিনাই মরুভূমিতে তাদের গুলির সামরিক মহড়া চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করায়, খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকেই উঁকি দিচ্ছে গভীর শঙ্কা আর অবিশ্বাসের ছায়া।
সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দে এখন আর আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না ইসরায়েল।
১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক বজায় ছিল, তা এখন এক নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গাজা সীমান্তের কাছাকাছি থাকা ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের মধ্যে এই মহড়া নিয়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত তাদের নিজেদেরই তৈরি করা এক মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটের প্রতিফলন।
তারা মনে করছে, সীমান্তের ওপারে মিশরের এই আস্ফালন কোনো সাধারণ মহড়া নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কোনো ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা।
ইসরাইলের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এখন রীতিমতো তটস্থ। বিনেই নেৎজারিম নামের এক সীমান্ত শহরের এক নারী বাসিন্দা সোজাসাপ্টা ভাষায় তার ভয় উগড়ে দিয়েছেন।
তিনি বলছেন, এখনকার ঘটনাপ্রবাহ যেন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই বিপর্যয়ের আগের মুহূর্তগুলোর হুবহু নকল।
ইসরায়েলিদের মনে এখন এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, যে সেনাবাহিনী কিছুদিন আগেই এক বিশাল ধাক্কা খেয়েছে, তারা কীভাবে তাদের ঠিক নাকের ডগায় একটি বিদেশি বাহিনীকে তাজা গুলি নিয়ে মহড়া দেওয়ার অনুমতি দেয়। তাদের ভয় হচ্ছে, গুলির শব্দের আড়ালে কোনো বড় ধরনের অনুপ্রবেশ বা হামলার ছক আঁকা হচ্ছে না তো?
সিনাইয়ের বিশাল এলাকা পড়ে থাকতে কেন ঠিক সীমান্তের কাঁটাতারের কাছেই মিশরকে মহড়া দিতে হবে, এই যুক্তিতে এখন সরগরম ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলো।
ইসরায়েলের সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গোষ্ঠী এখন তাদের রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ দিচ্ছে এই মহড়া বন্ধ করার জন্য। তাদের অভিযোগ, ইসরাইল রাষ্ট্র যেন তার সীমান্তবাসীদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
তারা পুরনো ক্ষোভ ঝেড়ে বলছেন যে, এক সময় গাজা থেকে উড়ে আসা আগুনের বেলুনকেও ইসরায়েলি সরকার গুরুত্ব দেয়নি, যার ফল হয়েছে ভয়াবহ। এখন যখন আবারও কিবুতজ নাহালের মতো এলাকায় গাজা সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে নতুন করে সন্দেহজনক তৎপরতা চোখে পড়ছে, তখন মিশরের এই মহড়াকে তারা কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারছে না।
যদিও কাগজে-কলমে এই মহড়া ইসরাইলের সাথে সমন্বয় করেই করা হচ্ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের ইসরায়েলিদের কাছে সেই আশ্বাসবাণী এখন শুধুই ফাঁকা বুলি মনে হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
পুরো বিষয়টাকে ইসরায়েলের ভেতরের কিছু মহল বেশ রঙ চড়িয়ে প্রচার করছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, মিশর এখন আঞ্চলিক মোড়লগিরি করার চেষ্টা করছে।
তারা অভিযোগ তুলছেন যে, মিসর বর্তমানে ইরানের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিচ্ছে এবং লেবানন কিংবা গাজার যুদ্ধবিরতি আলোচনায় নিজেদের নাক গলাতে চাইছে।
এমনকি কোনো কোনো ইসরায়েলি বিশ্লেষক এমনও বলছেন যে, মিশর আসলে ইসরাইলের ওপর চাপ তৈরি করে আমেরিকার কাছ থেকে বা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করতে চায়।
কিন্তু এইসব বিশ্লেষণের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক রূঢ় বাস্তবতা। আর তা হলো, ২০২৩ সালের পর থেকে গাজায় ইসরায়েল যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ আর ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, তার প্রভাবেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্কের ফাটল এখন চওড়া হচ্ছে।
মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সম্পর্ককে দীর্ঘকাল ধরে 'শীতল শান্তি' হিসেবে বর্ণনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা বরফশীতল পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি হামলার ফলে যখন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের জোর করে সিনাইয়ের দিকে ঠেলে দেয়ার একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন মিশরের ধৈর্যও বাঁধ ভাঙছে।
গেল বছরের শেষের দিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সরাসরি ইসরাইলকে 'শত্রু' হিসেবে সম্বোধন করেছেন, যা ২০১৪ সালে তার ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রথম। যদিও দুই দেশের মধ্যে বিশাল অংকের গ্যাস রপ্তানির চুক্তি বা সামরিক সমন্বয় টিকে আছে, তবু সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর সীমান্তের অস্থিরতা বলে দিচ্ছে যে, এই শান্তি চুক্তির দেয়ালটা এখন বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
মিসর হয়তো মহড়া দিচ্ছে তাদের নিজেদের এলাকাতেই, কিন্তু সেই গুলির আওয়াজ ইসরাইলের দম্ভের দেয়ালে ভালোই ফাটল এবং আতঙ্ক ধরাচ্ছে। সূত্র : আল জাজিরা