হরমুজ প্রণালিতে চলমান তীব্র সামরিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি বাণিজ্যকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্তও বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সমুদ্রে ভাসমান মাইনের আতঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর আকাশচুম্বী বিমা খরচের কারণে এই রুটটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত স্থলভিত্তিক অবকাঠামো ও পাইপলাইন নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকছে।
আমিরাত ও সৌদির মেগা উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থা বিবেচনা করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘অ্যাডনক’ ওমান উপসাগর ঘেঁষা ফুজাইরাহ বন্দর পর্যন্ত তাদের প্রধান পাইপলাইনটি জরুরি ভিত্তিতে সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে।
এই মেগা প্রকল্পটি সফল হলে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়েই কেবল স্থলপথের পাইপলাইনের মাধ্যমে আমিরাত দৈনিক ৩০ থেকে ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে পারবে।
একইভাবে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় খনিগুলো থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত দেশটির ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ বর্তমান বৈশ্বিক তেলবাজারকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করছে।
আমিরাত ও সৌদির এই কার্যকর পদক্ষেপ দেখে এখন কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ইরাকের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোও হরমুজকে এড়াতে নতুন বিকল্প রুট খোঁজা শুরু করেছে।
সমুদ্রের বিকল্প এখন রেলপথ ও মহাসড়ক
গত কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি—যেমন তেল শোধনাগার, এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল, সার এবং অ্যালুমিনিয়াম শিল্প—সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রনির্ভর ছিল।
দুবাইয়ের বিখ্যাত জেবেল আলি বন্দরসহ পারস্য উপসাগরের বড় বড় বন্দরগুলো আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনের প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করত।
তবে বর্তমান সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভারত মহাসাগরমুখী বন্দরগুলো এখন আঞ্চলিক অর্থনীতি সচল রাখার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গতি পেয়েছে রেলপথ ও সড়কভিত্তিক আঞ্চলিক প্রকল্পগুলো।
যেমন: যুদ্ধের আগে শারজাহর ‘খোরফাক্কান বন্দরে’ সপ্তাহে যেখানে মাত্র ২,০০০ কনটেইনার খালাস হতো, বর্তমান সংকটে তা জ্যামিতিক হারে বেড়ে সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। এর ফলে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে একটি নিশ্ছিদ্র স্থলভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ইরানের কৌশল ও স্থলপথের সীমাবদ্ধতা
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ইরান নিজেও হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরের ‘জাস্ক বন্দরে’ নিজস্ব পাইপলাইন অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তবে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরানের সেই প্রকল্প আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারেনি।
এই ব্যর্থতার মাঝেই বর্তমানে তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচেটিয়া সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ‘ফি বা টোল’ আরোপের প্রস্তাব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত: ইরান এই জলপথে যত বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করবে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলো বিকল্প স্থলপথ ব্যবহারে তত বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে।
তবে সব বাণিজ্যিক পণ্য রাতারাতি স্থলপথে পরিবহন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এখনো পুরোপুরি বিশেষায়িত জাহাজনির্ভর। এছাড়া সার বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো ভারী পণ্য স্থলপথে পরিবহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
তবুও, বর্তমানের এই মহাসংকট মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে শিক্ষা দিচ্ছে যে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে সমুদ্রনির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি স্থায়ী বিকল্প স্থলভিত্তিক সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তোলা কতটা জরুরি।