যে বিমান হামলা বদলে দিয়েছিল মার্কিন-কিউবা সম্পর্ক

ফ্লোরিডা উপকূলে ৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে দুটি বেসামরিক বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ (ইন্ডাইটমেন্ট) দায়ের করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

গত বুধবার মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।

কিউবার সামরিক বাহিনীর চালানো সেই প্রাণঘাতী বিমান হামলাটি দুই দেশের সম্পর্কে ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটের জন্ম দিয়েছিল, যার পরোক্ষ প্রভাব আজ ৩০ বছর পরও বিদ্যমান।

১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মিয়ামি-ভিত্তিক কিউবান নির্বাসিতদের মানবাধিকার সংগঠন 'ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ'-এর তিনটি ছোট সেসনা (Cessna) বিমান ফ্লোরিডা প্রণালিতে একটি রুটিন মিশনে বের হয়। কিউবার তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনৈতিক মিত্র হারানোর পর ১৯৯০-এর দশকে কিউবায় চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও খাদ্য সংকটের মুখে হাজার হাজার কিউবান তখন ভেলায় চড়ে বা যেকোনো উপায়ে ফ্লোরিডা উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।

তাদের জীবন বাঁচাতে এবং মার্কিন কোস্ট গার্ডকে তাদের অবস্থান জানাতে মিয়ামির কিউবান নির্বাসিতরা জোসে বাসুলতোর নেতৃত্বে এই সংস্থাটি গড়ে তোলেন। তবে কিউবা সরকারের দাবি ছিল, ত্রাণ দেওয়ার আড়ালে এই কর্মীরা কিউবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে হাভানার ওপর লিফলেট ফেলছিল, যা কিউবার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

ঐদিন মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে কিউবান ফাইটার জেট থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রে দুটি বেসামরিক বিমান আকাশে প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এতে বিমানে থাকা চারজন আরোহী—আর্মান্দো আলেজান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কোস্টা, মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা এবং পাবলো মোরালেস তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন মার্কিন নাগরিক এবং একজন কিউবান নাগরিক ছিলেন। জোসে বাসুলতোর পাইলট করা তৃতীয় বিমানটি কোনোমতে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

আমেরিকার পক্ষ থেকে দাবি করা হয় বিমান দুটি হাভানার উত্তরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছিল। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা এবং ওএএস (OAS) এই দাবিকে সমর্থন করে কিউবাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে। অন্যদিকে কিউবা দাবি করে, তারা নিজেদের আকাশসীমাতেই বিমান দুটিকে ধ্বংস করেছে।

ইতিহাসবিদ জোয়ান আন্তোনিও ব্লাঙ্কো একে ফিদেল কাস্ত্রোর সাজানো 'অ্যাম্বুশ' বা ফাঁদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কাস্ত্রোর গোয়েন্দারা ওই সংগঠনে গুপ্তচর রেখে আগেই বিমানের রুট জেনে নিয়েছিল। ব্লাঙ্কোর মতে, রাজনৈতিকভাবে ফিদেল কাস্ত্রো এর জন্য দায়ী হলেও তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর মন্ত্রী হিসেবে রাউল কাস্ত্রো ছিলেন এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী। ২০০৬ সালে ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়েও রাউল কাস্ত্রোকে এই অপারেশনের বিবরণ দিতে শোনা গেছে।

ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসনের সাথে কিউবার কর্মকর্তাদের সম্পর্কের এক ধরনের স্বাভাবিকীকরণের গোপন আলোচনা চলছিল। ফিদেল কাস্ত্রো ভয় পেয়েছিলেন যে, ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক ভালো হলে কিউবায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের হাওয়া লাগবে, যা তার একচ্ছত্র ক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। আর এই মেলবন্ধন রুখতেই বিমান দুটিকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা ক্লিনটন প্রশাসনের সাথে আলোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়।

এই ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এর তীব্র নিন্দা জানান এবং কিউবার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহুগুণ কঠোর করেন। কিউবার ভেতরেও স্টালিনপন্থী দমন-পীড়ন আরও তীব্র হয়। কিউবা কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানালে, যুক্তরাষ্ট্র কিউবান সরকারের হিমায়িত ৯৩ মিলিয়ন ডলার সম্পদ থেকে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়।

রাউল কাস্ত্রো ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ছাড়লেও এখনো তাকে দেশের পর্দার আড়ালের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি মনে করা হয়। এই মামলাটি কিউবার জন্য এমন এক নাজুক সময়ে এলো যখন তারা আবারও চরম অর্থনৈতিক সংকট ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গত জানুয়ারি মাসে ভেনিজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর কিউবা তাদের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সমর্থনও হারিয়েছে। তিন দশক পুরনো এই মামলাটি কিউবা এবং মিয়ামির কিউবান নির্বাসিত সম্প্রদায়ের কাছে আজও এক বিশাল রাজনৈতিক ও আবেগীয় ইস্যু। সূত্র: বিবিসি