বিজেপিকে হারালো জেন-জিদের নতুন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

ভারতে বেকারত্ব, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের পুঞ্জীভূত হতাশা থেকে জন্ম নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী অনলাইন আন্দোলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলা এই প্ল্যাটফর্মটির নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janata Party - CJP)। 

মূলত মূলধারার রাজনীতির প্রতি অনীহা ও নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবিকে এক সুতোয় বেঁধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে দেশটির জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম।

মাত্র ৫ দিনের মাথায় এই ব্যঙ্গধর্মী প্ল্যাটফর্মটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী (Followers) সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিজেপির চেয়েও জনপ্রিয় ‘সিজেপি’

বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির অনুসারী সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ (১৩.৯ মিলিয়ন)। অন্যদিকে, বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারী সংখ্যা মাত্র ৮৮ লাখ (৮.৮ মিলিয়ন)। একটি স্মার্টফোনের ওপর তেলাপোকার ছবিযুক্ত লোগো ব্যবহার করা সিজেপি নিজেদের মূলত অলস ও বেকার তরুণদের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।

যেভাবে জন্ম নিলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে জানান এর পেছনের গল্প। সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে বেকার তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। এই মন্তব্য ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়।

যদিও পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি সাধারণ তরুণদের নয়, বরং ভুয়া ডিগ্রিধারী ও প্রতারকদের বোঝাতে ওই মন্তব্য করেছিলেন। তবে ততক্ষণে সেই ক্ষোভকে পুঁজি করে ডিজিটাল দেওয়ালে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পাবলিক রিলেশনস নিয়ে পড়াশোনা শেষ করা অভিজিৎ বলেন:

‘এটি ভারতের রাজনৈতিক ভাষ্য বদলে দেওয়ার একটি প্রতীকী আন্দোলন। দেশের তরুণরা মূলধারার রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছে। কেউ আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলো শুনতে চাইছে না।’

মিম আর ব্যঙ্গের ছলে গুরুতর প্রতিবাদ

সিজেপির ইনস্টাগ্রাম পেজে তরুণদের তৈরি নানা ধরনের ভিডিও, মিম (Meme) ও গ্রাফিক্স প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব কনটেন্টে অত্যন্ত হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গের ছলে কিছু গুরুতর বিষয় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে:

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ

শিক্ষা সংকট ও প্রশ্নপত্র ফাঁস

বেকারত্ব ও আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি

বিশেষ করে সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ভারতের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET) নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা-ও এই প্ল্যাটফর্মে তরুণদের ক্ষোভের বড় কারণ।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভারতের জেন-জি

চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, ভারতের জেন-জি প্রজন্ম (১৯৯৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণ) মারাত্মক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশটির ৫৪ শতাংশ জেন-জি তরুণ বাড়ি কেনার মতো বড় সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন।

উল্লেখ্য, ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ, যেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৩.১ শতাংশ হলেও, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ১০ শতাংশ।

লক্ষ্য ও সদস্য হওয়ার ‘ব্যঙ্গাত্মক’ যোগ্যতা

বাংলাদেশ বা নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের মতো নিজেদের কোনো সহিংস বা চরমপন্থী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করাতে নারাজ অভিজিৎ দীপকে। তার ভাষায়, এটি ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে, তবে যা-ই হবে, সবকিছু হবে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে।

ইতোমধ্যে গুগল ফরমের মাধ্যমে ৪ লাখের বেশি মানুষ সিজেপিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছেন, যাদের ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এই দলের সদস্য হওয়ার জন্য ৪টি মজাদার যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে:

১. আবেদনকারীকে বেকার হতে হবে।
২. অলস হতে হবে।
৩. সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে।
৪. পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে জানতে হবে।

লখনউয়ের ২৬ বছর বয়সী সিজেপি সদস্য সিদ্ধার্থ কানৌজিয়া বলেন, ‘এই দেশে তরুণদের কথা কেউ শোনে না, ভালো চাকরিও নেই। সিজেপি অন্তত আমাদের হয়ে কথা বলছে। আর তেলাপোকার লোগোটি হলো টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক; একে সহজে ধ্বংস করা যায় না, সব বাধা পেরিয়ে এটি আবার ফিরে আসে।’